
সংগৃহীত ছবি
ব্রিটেনের এক ছোট ফ্ল্যাটে ঝুলছে স্কুলব্যাগ। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে রঙিন খেলনা, কিন্তু যার জন্য সব জিনিসপত্র, সেই শিশুটি এখানে নেই। ছেলেটির বয়স এখন সাত। ও আর এ ফ্ল্যাটে থাকে না। প্রতিদিন সকালে স্কুলব্যাগটির দিকে তাকিয়ে থাকেন মা জেনি (ছদ্মনাম)। মনে হয়, স্কুলে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু ছেলে তো আর সঙ্গে নেই। চোখ ভিজে আসে কান্নায়, নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো ঘর।
ব্রিটেনে পারিবারিক কলহ, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, কাজের চাপ বা মাদকাসক্তি অনেক শিশুর জীবনকে অনিশ্চিত ও বিষণ্ণ করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে শত শত শিশু আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। কখনও কখনও আদালত মা-বাবা দুজনকেই অনিরাপদ মনে করলে শিশুকে সরকারি তত্ত্বাবধানে পাঠানো হয়।
জেনির মূল বাড়ি বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলায়। ছয় মাস আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। তিনি ভেবেছিলেন, সন্তান তার কাছে থাকবে, যেমন বাংলাদেশে হয়। কিন্তু ব্রিটেনে সেই ধারণা ভেঙে যায়। আদালতের নির্দেশে সন্তান এখন বাবার কাছে। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন দেখা করার অনুমতি পান। এই দুই দিনেই যেন জীবনের প্রাণ ফিরে আসে, বাকিটা সময় তিনি থাকেন নিস্তেজ। জেনি বলেন, ‘ও যখন চলে যাচ্ছিল, আমি দরজার পাশে বসে কাঁদছিলাম। মা হয়েও প্রতিদিন বুকে জড়িয়ে রাখতে পারি না।’
লন্ডনে বসবাসরত সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মো. আহমদের মেয়েকে মা কাছে আছে। তিনি সপ্তাহে একদিনই মেয়েকে দেখতে পান। আহমদ বলেন, ‘ওই একদিনই বেঁচে থাকার শক্তি দেয়। ওই অক্সিজেনে বাকি ছয় দিন টিকে থাকি।’
বার্মিংহামের মো. হোসেনের ছয় বছর বয়সী মেয়ে মাসে একবারই দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘মেয়ে যখন জড়িয়ে ধরে বলে, “আব্বু, তুমি কি আবার চলে যাবে?” তখন ভেতরে ভেঙে পড়ি। আমি খারাপ বাবা নই, কিন্তু আদালতে প্রমাণ করতে পারিনি।’
যুক্তরাজ্য সরকারের ২০২৩ সালের জাতিগত তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক আদালতের দেখভালের মামলায় ৪ শতাংশ শিশু এশীয় বা এশীয় ব্রিটিশ পরিবারের। এর মধ্যে বাংলাদেশি শিশু প্রায় ১ শতাংশ।
নাফিল্ড পরিবারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেসরকারি পরিবারের আইন সংক্রান্ত মামলায় এশীয় অংশগ্রহণ প্রায় ৮ শতাংশ। তবে পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে অসংখ্য ভাঙা পরিবারের মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক সমস্যার চিত্র। অনেক পরিবার নিজেরাই সন্তান দেখভালে নানা জটিলতা ও চাপের মুখোমুখি।
ব্রিটেনে পরিচিত আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, ‘এক দশকে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এ ধরনের আইনি লড়াই বেড়েছে। শিশু সুরক্ষা আইন খুবই কঠোর। এখানে মা বা বাবার পরিচয় নয়, শিশুর নিরাপত্তা ও কল্যাণই মুখ্য।’
আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক পরিবেশ ও স্বাভাবিক বিকাশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। মা মাদকাসক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে থাকলে আদালত বাবার পক্ষে যায়। উভয়কেই অনিরাপদ মনে হলে প্রথমে আত্মীয়, না হলে কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়।
তারা আরও জানান, ভাষাগত দুর্বলতা, আইনি অজ্ঞতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক বাংলাদেশি পরিবার আদালতে নিজ অবস্থান যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না।










































