শনিবার । মার্চ ২১, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক ক্যারিয়ার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বেতন আছে, উন্নতি নেই: জীবনমান দ্বিগুণ হতে লাগবে ১৩৭ বছর!


corporate womenসকাল থেকে সন্ধ্যা হাড়ভাঙা খাটুনি, মাস শেষে বেতনও মিলছে। কিন্তু মাসের শেষ দিকে পকেটে টান। জীবনযাত্রার মান কি আগের চেয়ে বেড়েছে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন উন্নত বিশ্বের কর্মজীবীরা। যুক্তরাজ্যের নামী গবেষণা সংস্থা ‘রেজোল্যুশন ফাউন্ডেশন’ গত ১০ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বর্তমান গতিতে চললে দেশটির স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হতে সময় লাগবে প্রায় ১৩৭ বছর! 

দুই দশকের বেতন স্থবিরতা ও গভীর সংকট
সংস্থাটি তাদের ‘আনসাং ব্রিটেন’ (Unsung Britain) শীর্ষক প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গত দুই দশক ধরে চাকরির বাজারে বেতনের স্থবিরতা এক ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। বেতন ও জীবনযাত্রার এই ব্যবধান না ঘুচলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রতি বছর বাড়তেই থাকবে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৫ সাল পর্যন্ত চিত্রটি এমন হতাশাজনক ছিল না। তখন বার্ষিক গড় আয় বাড়ত ১.৮ শতাংশ হারে। অর্থাৎ, মাত্র ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই একজন কর্মজীবীর জীবনযাত্রার মান দ্বিগুণ হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০০৫ সালের পর থেকে এই চাকা যেন থমকে গেছে। কর ও আবাসন খরচ মেটানোর পর কর্মজীবীদের হাতে থাকা প্রকৃত আয়ের প্রবৃদ্ধি এখন মাত্র ০.৫ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের চেয়ে এখনকার কর্মীরা অনেক বেশি খাটছেন কিন্তু সেই বাড়তি পরিশ্রমের সুফল তাদের জীবনে পৌঁছাচ্ছে না।

Corporate Person‘ওয়ার্কিং পুওর’
রেজোল্যুশন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী রুথ কার্টিস স্পষ্টভাবেই বলেন, “একটি চাকরি থাকা মানেই যে মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে, সেই নিশ্চয়তা এখন আর নেই।” বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ পরিবার এই সংকটের মুখে।

তৈরি হয়েছে ‘ওয়ার্কিং পুওর’ (Working Poor) বা ‘কর্মজীবী দরিদ্র’ নামে এক নতুন শ্রেণি। এরা বেকার নন, নিয়মিত চাকরি করছেন কিন্তু তাদের প্রাপ্ত বেতন দিয়ে মাস শেষে মৌলিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে আয়ের অনুপাতে স্থানীয় কর দেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্ররা ধনীদের চেয়ে চার গুণ বেশি চাপে থাকেন।

বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: বেতন বনাম মূল্যস্ফীতি
ব্রিটেনের এই হাহাকার দূর প্রবাসের মনে হলেও আমাদের দেশের পটভূমিতে এটি ভীষণ চেনা। যদিও উন্নত বিশ্বে এই সংকটের মূলে রয়েছে বেতনের স্থবিরতা, বাংলাদেশে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি।

বাংলাদেশেও এখন অনেক কর্মজীবী মানুষ ‘ওয়ার্কিং পুওর’ শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছেন। ঢাকা বা চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের একজন কর্মজীবী ব্যক্তি নিয়মিত চাকরি করেও মাস শেষে খাবার ও বাসা ভাড়ার হিসাব মেলাতে পারছেন না। ব্রিটেনের ১ কোটি ৩০ লাখ পরিবারের মতো আমাদের শ্রমবাজারেও সেই চাপা অসন্তোষের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এখানেও পরোক্ষ করের বোঝা নিম্নবিত্তের ওপরই বেশি এবং দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে তাদের সঞ্চয় এখন শূন্যের কোঠায়।

corporate womenমুক্তির উপায় কী?
২০২৬ সালের এই উত্তাল শ্রমবাজারে কেবল একটি প্রথাগত চাকরির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন:

  • বেতন কাঠামো পরিবর্তন: রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেতন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
  • সমন্বয়: প্রকৃত আয়ের সুরক্ষা দিতে হলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন সমন্বয় করা জরুরি।
  • দক্ষতা উন্নয়ন: কেবল কায়িক শ্রম নয়, আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী হতে হবে, যাতে আয়ের বিকল্প পথ তৈরি হয়।

দিন শেষে লন্ডন হোক বা ঢাকা, সারা বিশ্বের চাকরিজীবীদের লড়াইটা আজ একই সমতলে। মানুষ তার কর্মক্ষম সময়েই সচ্ছলতা উপভোগ করতে চায়, ১৩৭ বছর পর নয়। তাই এখনই প্রয়োজন চাকরির বাজারে কার্যকর সংস্কার এবং ন্যায্য মজুরি কাঠামো।

সূত্র: গার্ডিয়ান ও রেজোল্যুশন ফাউন্ডেশন প্রতিবেদন