শুক্রবার । মার্চ ২০, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ২০ মার্চ ২০২৬, ৪:১০ অপরাহ্ন
শেয়ার

যুদ্ধে ম্লান মধ্যপ্রাচ্যের ঈদ


Eid Middle East

ইরানে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম উৎসবের আনন্দকে ছাপিয়ে উঠেছে

যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। লেবানন, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এবং ইরানে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম উৎসবের আনন্দকে ছাপিয়ে উঠেছে।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ডাউনটাউন ওয়াটারফ্রন্টে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরছেন আলা নামের এক সিরীয় শরণার্থী। অধিকৃত গোলান হাইটসের বাসিন্দা আলা বর্তমানে গৃহহীন। দিনভর শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও তিনি কোনো আশ্রয় পাননি।

তিনি আগে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহতে বাস করতেন, যা ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলায় লেবাননে ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বর্তমানে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার প্রধান চিন্তা; ঈদের কোনো পরিকল্পনা তার নেই।

আলা জানান, স্কুলে থাকার আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে কর্নিশে গিয়ে ঘুমাই। এরপর পৌরসভার লোকজন আমাকে ডাউনটাউন ওয়াটারফ্রন্টে আসতে বলে। তবে এখনও তিনি কোনো তাঁবু জোগাড় করতে পারেননি এবং খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাচ্ছেন।

বৈরুতের অভিজাত রেস্তোরাঁ ও বারের জন্য পরিচিত এই এলাকা এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুর শহরে পরিণত হয়েছে। লেবাননজুড়ে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চলা ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই দেশটি আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে ইরানেও। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে দেশটি। চলমান সংঘাত ও পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেকেই ঈদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছেন না। রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে বোমা হামলার ক্ষতির কারণে কেনাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এছাড়া ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টিও কিছু মানুষের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করেছে। সরকারবিরোধী অনেক ইরানি এখন ধর্মীয় উৎসব পালনের বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখছেন। এ বছর পারস্য নববর্ষ নওরোজ ও ঈদ একই সময়ে পড়ায় অনেকে ঈদের পরিবর্তে নওরোজ উদযাপনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

গাজা উপত্যকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। পণ্য প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, এমনকি শিশুদের খেলনার দামও নাগালের বাইরে চলে গেছে।

গাজা সিটির বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী খালেদ দীব জানান, ঈদের আগে বাজারের অবস্থা দেখতে তিনি রেমাল মার্কেটে গিয়েছিলেন। বাইরে থেকে বাজারে ঈদের আমেজ দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবে মানুষের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ, বলেন তিনি।

একসময় নিজের সুপারমার্কেট ছিল উল্লেখ করে খালেদ বলেন, ঈদে আমি মেয়েদের ও বোনদের উপহার দিতাম, ঘর সাজাতাম, বাচ্চাদের জন্য নতুন কাপড় কিনতাম। কিন্তু এবার কিছুই সম্ভব নয়। বর্তমানে ফলমূল ও সবজির দাম তার নাগালের বাইরে।

একই হতাশার কথা জানিয়েছেন তিন সন্তানের জননী শিরিন শ্রেইম। তিনি বলেন, আমাদের ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ। দুই বছরের যুদ্ধ শেষে আমরা এমন এক বাস্তবতায় আছি, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, আমার বাসার দেয়াল ভেঙে গেছে। আমরা ত্রিপল ও কাঠ দিয়ে কোনোভাবে বসবাস করছি। অনেকেই রাস্তায় কাপড়ের তাঁবুতে থাকছেন। তারা কীভাবে ঈদ উদযাপন করবেন?

এদিকে বৈরুতে রাজনৈতিক গবেষক করিম সাফিয়েদ্দিন বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন। তার মতে, যুদ্ধের মধ্যেও পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখা টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, সংহতি ছাড়া আমরা সমাজ বা দেশ গড়তে পারব না। এই কঠিন সময়েও একটি ইতিবাচক ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য এটিই প্রথম পদক্ষেপ।