
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুরিতন ও মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং
মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ ষষ্ঠ বছরে প্রবেশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সরবরাহ করা যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত সামরিক কৌশল মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে।
চীনের প্রভাব মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্তবর্তী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি হলেও, রুশ অস্ত্রশস্ত্র জান্তাকে বাস্তব যুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসইএএস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়ান স্টোরি বলেন, রাশিয়ার অস্ত্র মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে ধ্বংসাত্মকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা শুধু বিদ্রোহীদের নয়, বেসামরিক স্থাপনাও—যেমন স্কুল ও হাসপাতাল—আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
স্টোরির মতে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত তথাকথিত “মিট অ্যাসল্ট” বা মানবঢেউ কৌশলও গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লাখ বেড়েছে, যা এই ধরনের আক্রমণের জন্য জনবল জোগাচ্ছে।
রাশিয়া-মিয়ানমার ঘনিষ্ঠতা
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে প্রকাশ্যে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছে এবং সামরিক সহায়তাও দিয়েছে বলে জানা যায়।
বিনিময়ে রাশিয়া মিয়ানমারকে গোলাবারুদ, ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। বিশ্লেষকরা জানান, রুশ নির্মিত এইউ-৩০ যুদ্ধবিমান এবং এমআই-৩৮টি হেলিকপ্টার মিয়ানমারের আকাশ শক্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মিয়ানমারে বিমান হামলায় বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে।
প্রথম দিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ড্রোন ব্যবহারে এগিয়ে থাকলেও বর্তমানে সামরিক বাহিনী আধুনিক রুশ ড্রোন ব্যবস্থার কারণে এগিয়ে গেছে। নজরদারি, হামলা এবং আত্মঘাতী ড্রোন—সব ক্ষেত্রেই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তারা।
২০২৪ সালে মিয়ানমার একটি বিশেষ ড্রোন ওয়ারফেয়ার ডিরেক্টরেট গঠন করে, যা যুদ্ধের কৌশলে ড্রোনকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ফাইবার-অপটিক ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে, যা ইলেকট্রনিক জ্যামিং থেকে নিরাপদ। তবে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সমন্বয়ের অভাবে এই প্রযুক্তি বড় পরিসরে প্রভাব ফেলতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বাড়ছে সহিংসতা
২০২১ সালের পর থেকে মিয়ানমারে প্রায় ৯৬,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি জানিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৬,০০০ বিমান হামলা এবং ৯০০-র বেশি ড্রোন হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
সম্প্রতি মিয়ানমারের বাগো অঞ্চলে বিমান হামলায় অন্তত ৩০ জন গ্রামবাসী নিহত হন। রাখাইন রাজ্যে একটি বন্দিশিবিরে হামলায় নিহত হন আরও অন্তত ১১৬ জন।
রাশিয়া ও মিয়ানমার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। স্যাটেলাইট নজরদারি কেন্দ্র, যৌথ নৌ মহড়া এবং এমনকি মহাকাশ সহযোগিতার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার লক্ষ্য হলো অস্ত্র বাজার ধরে রাখা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মাঝেও তার কূটনৈতিক প্রভাব জারি রাখা।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রাশিয়া অতীতে তার মিত্রদের সংকটের সময় সবসময় পাশে দাঁড়ায়নি। ফলে মিয়ানমারের সামরিক সরকার বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়লে মস্কোর ভূমিকা অনিশ্চিত।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো অভিযোগ করছে যে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছে না।
একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার সহায়তা না থাকলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এতদিনে পরাজিত হতো।
আল জাজিরা অবলম্বনে
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প









































