
শ্রীলঙ্কা তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ চলতে থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় আবারও অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার পাহাড়ি শহর ক্যান্ডিতে এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে থ্রি-হুইলার চালক কীর্থি রত্না তার সাপ্তাহিক বরাদ্দের পেট্রোল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বর্তমানে সরকার তার মতো টুকটুক চালকদের জন্য সপ্তাহে মাত্র ২০ লিটার পেট্রোল বরাদ্দ করেছে।
এর আগে প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো সময় জ্বালানি কিনতে পারলেও, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।
ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিশ্বে পরিবহন হওয়া প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে যায়।
শ্রীলঙ্কা তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে এই পথ দিয়ে। দেশটির মজুত সক্ষমতাও খুব সীমিত—মাত্র এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি সংরক্ষণ করা যায়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার আবারও কিউআর-কোডভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে সাপ্তাহিক রেশন অনুযায়ী মোটরসাইকেলে ৮ লিটার পেট্রোল, টুকটুকে ২০ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ২৫ লিটার, বাসে ১০০ লিটার ডিজেল এবং ট্রাকে ২০০ লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি সার সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে, কারণ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। গবেষকদের মতে, এর প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশটিতে খাদ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি এখনও অনেক শ্রীলঙ্কানের মনে তাজা। সেই সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসার নীতির কারণে দেশটি প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জ্বালানিসহ নানা পণ্যের আমদানি সীমিত হয়ে পড়ে এবং নিত্যপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
তীব্র জনবিক্ষোভের মুখে রাজাপাকসা ২০২২ সালের জুলাইয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করেন কীর্থি রত্না। তিনি বলেন, এবারের সংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে দায় দেওয়া যায় না, কারণ ইরানের যুদ্ধ শ্রীলঙ্কার নিয়ন্ত্রণে নয়।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা দিসানায়েকের সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণে বাসভাড়া ১২ শতাংশের বেশি বাড়ানো হলেও জ্বালানির দাম কমলে তা কমানো হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
তবুও পরিস্থিতি সহজ নয়। সরকারি তথ্যমতে, জ্বালানির দাম বাড়ানো সত্ত্বেও প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার লোকসান গুনছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যতটা বেড়েছে, দেশের বাজারে তার চেয়ে কম বাড়ানো হয়েছে—যাতে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত চাপের মুখে না পড়ে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শ্রীলঙ্কা সরকার বুধবার সরকারি অফিস ও স্কুল বন্ধ রাখার নীতিও চালু করেছে।
অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনাও করছে শ্রীলঙ্কা। রাশিয়ার জ্বালানি উপমন্ত্রী রোমান মারশাভিন সম্প্রতি এ বিষয়ে আলোচনার জন্য শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন।
ইরানও শ্রীলঙ্কাকে জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব দিলেও জ্বালানি পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জাহাজ না থাকায় তা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে সরকার।
এদিকে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহেও সংকট দেখা দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত লিট্রো গ্যাসের সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ৮ হাজার মেট্রিক টন, অথচ মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। যুদ্ধ শুরুর পর এলপিজির দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। কারণ সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।
টুকটুক চালক কীর্থি রত্না বর্তমান পরিস্থিতির এক অদ্ভুত বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালের সংকটে জ্বালানিবাহী জাহাজ আমাদের উপকূলে নোঙর করে ছিল, কিন্তু সরকার কেনার টাকা পায়নি। এখন সরকারের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা আছে, কিন্তু জাহাজই আসছে না।’
আল জাজিরা অবলম্বনে




































