সোমবার । এপ্রিল ৬, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৬ এপ্রিল ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

ডিজিটাল অন্ধকারে ইরান, বাড়ছে হতাশা


internet iran

২০২৬ সালের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময়ই ইরানের সাধারণ মানুষ কার্যত ডিজিটাল অন্ধকারে কাটিয়েছে

যুদ্ধ চলাকালে ইরানে আরোপিত প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বৈশ্বিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, এটি এখন পর্যন্ত কোনো দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম জাতীয় পর্যায়ের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগে জানুয়ারিতেও দেশজুড়ে ২০ দিন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল, সেসময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হয়। ফলে ২০২৬ সালের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময়ই ইরানের সাধারণ মানুষ কার্যত ডিজিটাল অন্ধকারে কাটিয়েছে।

নেটব্লকস জানায়, ইরানই প্রথম দেশ যেখানে পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ থাকার পর তা বন্ধ করে জাতীয় নেটওয়ার্কে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। মিয়ানমার, সুদান, কাশ্মীর ও তিগ্রায় অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও, এমন সর্বাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বন্ধের নজির আর কোথাও নেই। ইউক্রেন বা গাজাসহ সাম্প্রতিক কোনো যুদ্ধেও পুরো একটি দেশকে এভাবে অফলাইনে পাঠানো হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।

ইন্টারনেট বন্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জানুয়ারির ব্ল্যাকআউটের সময় সরকার নিজেই জানিয়েছিল, তিন সপ্তাহের বেশি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলে অনেক অনলাইন ব্যবসা টিকে থাকতে পারে না এবং প্রতিদিন কয়েক কোটি ডলারের সরাসরি ক্ষতি হয়। যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহ পার হলেও সরকার এখনো স্পষ্ট করে জানায়নি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ডিজিটাল খাত পুনরুদ্ধার করা হবে।

তেহরানের কাছাকাছি কারাজ শহরের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পণ্য ডিজাইনার কামরান জানান, সাম্প্রতিক ছাঁটাইয়ে তিনি চাকরি হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আগের ছাঁটাইয়ে টিকে গিয়েছিলাম, কিন্তু এবার আর পারলাম না।’ তিনি নতুন কাজ খোঁজার চেষ্টা করছেন, তবে বিপুলসংখ্যক বেকারের ভিড়ে সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

একটি ডেটা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানেও কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আপাতত ছাঁটাই এড়াতে কম বেতন বৃদ্ধিতে সম্মত হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে যুদ্ধের কারণে ইরানের ইস্পাত কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধের আগেই দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বে ভুগছিল।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়েছে। সীমিত সংখ্যক ব্যক্তি—যাদের সরকার অনুমোদন দিয়েছে—বা উচ্চমূল্যে প্রক্সি সংযোগ কিনতে সক্ষম ব্যক্তিরাই আংশিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি গত মাসে বলেন, ‘যারা দেশের কথা বাইরের বিশ্বে পৌঁছে দিতে পারে’, কেবল তাদেরই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, তিনি ও তার বন্ধুরা সামান্য সময়ের সংযোগে, টেলিভিশন ও ফোনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ কেউ চাকরি হারিয়েছি, সবাই উদ্বিগ্ন—এই সপ্তাহে বিদ্যুৎ থাকবে কিনা, সেটাও নিশ্চিত নয়।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোতে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন, বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু লক্ষ্য করে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী অবরোধ বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যদিও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ হিসেবে সরকার ‘ইন্টারনেট প্রো’ নামে সীমিত আন্তর্জাতিক সংযোগ চালুর পরিকল্পনা করছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীদের জন্য এই সংযোগ পেতে নিবন্ধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্যে বিক্রি করা হবে।

উল্লেখ্য, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নির্বাচনী প্রচারণায় ইন্টারনেট উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেননি।

আল জাজিরা অবলম্বনে

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প