
ভারত তথা উপ মহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে মারা গেছেন। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯২ বছরে প্রয়াত হন তিনি।
আশা ভোঁসলে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী লতা মুঙ্গেশকরের ছোট বোন।

গত ১১ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হলে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
আগামীকাল সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তার মরদেহ তার নিজ বাসভবনে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। বিকেল ৪টায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করা এই শিল্পী অল্প বয়সেই সংগীতজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি হিন্দি, মারাঠি, বাংলা ও গুজরাটি সহ একাধিক ভাষায় হাজার হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলির গোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেতা। অল্প বয়সেই বাবাকে হারানোর পর পরিবার কোলহাপুর এবং পরে মুম্বাইয়ে চলে আসে। সেখানেই বড় বোন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তিনি সঙ্গীতজীবন শুরু করেন।
১৯৪৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র মাঝা বাল-এ “চলা চলা নব বালা” গান দিয়ে তার সঙ্গীতজীবনের সূচনা। ১৯৪৮ সালে চুনারিয়া ছবির “সাওয়ান আয়া” গানের মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রাত কি রানি ছবিতে তার প্রথম একক গান প্রকাশিত হয়।
পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকে বলিউডের স্বর্ণযুগের অন্যতম কণ্ঠ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশ ও মান্না দে’র মতো শিল্পীদের সঙ্গে তিনি সেই সময়ের সঙ্গীত জগৎকে সমৃদ্ধ করেন।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠ ছিল বহুমাত্রিক—ফিল্মি গান, পপ, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ভজন, গজল, লোকসংগীত, কাওয়ালি থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত—সব ধারাতেই তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি ২০টিরও বেশি ভাষায় গান রেকর্ড করেন এবং তার গাওয়া গানের সংখ্যা ১২ হাজারেরও বেশি।
আশা ভোঁসলের সঙ্গীতজীবন ছিল একইসঙ্গে বৈচিত্র্যে ভরপুর—মধুর গজল থেকে উদ্দাম ক্যাবারে গান- সবক্ষেত্রেই তিনি নিজস্ব ছাপ রেখেছেন। ও.পি. নয়্যার-এর সঙ্গে তার কাজ “আও হুজুর তুমকো” ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আর.ডি. বর্মণের সঙ্গে “চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে” আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে আছে।
“পিয়া তু আব তো আজা” (কারাভান) এবং “ইয়ে মেরা দিল” (ডন) গানের মাধ্যমে তিনি বলিউডে নতুন ধারা তৈরি করেন। একই সঙ্গে “ইন আঁখোঁ কি মাস্তি” ও “দিল চিজ কিয়া হ্যায়”-এর মতো গানে তার শাস্ত্রীয় দক্ষতা স্পষ্ট হয়।
নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজারের শুরুর দিকেও তিনি আধুনিক সুরের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। এ.আর. রহমানের সঙ্গে “তানহা তানহা” ও “রঙ্গীলা রে” (রঙ্গীলা) গানগুলো জনপ্রিয় হয়। এছাড়া “জরা সা ঝুম লুঁ ম্যায়” (দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে) এবং আদনান সামির সঙ্গে “কভি তো নজর মিলাও” গানও ব্যাপক সাফল্য পায়।
ভারতের সঙ্গীতে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০০ সালে ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে পদ্ম বিভূষণ লাভ করেন। এছাড়া “দিল চিজ কিয়া হ্যায়” (উমরাও জান, ১৯৮১) এবং “মেরা কুছ সামান” (ইজাজত, ১৯৮৭) গানের জন্য তিনি দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
ব্রিটিশ ব্যান্ড কর্নারশপ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৯৭ সালে “ব্রিমফুল অফ আশা” গানটি প্রকাশ করে, যা যুক্তরাজ্যের চার্টের শীর্ষে পৌঁছায়।
আশা ভোঁসলের মৃত্যু ভারতীয় সঙ্গীতের এক স্বর্ণযুগের অবসান ঘটালেও, তার গান কোটি ভক্তের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।











































