
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এবার ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যের ক্ষমতা দখল করেছে দলটি।
তবে পরাজয় মেনে নিতে নারাজ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ‘ভোট লুট’ করে বিজেপি জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকেও সরে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। যদিও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিয়েছেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আবারও আন্দোলনের রাজনীতিতে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন মমতা। একসময় যেভাবে রাস্তায় নেমে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন, সেই পুরোনো রাজনৈতিক ভূমিকায় ফিরতে চান তিনি। যদিও এক্ষেত্রে অন্যান্য নানা বাধার পাশাপাশি তার বয়সও একটা ফ্যাক্টর।
মমতা যদিও বলেছেন, ‘আমি এখন মুক্ত পাখি। একসময় রাস্তায় ছিলাম, আবারও রাস্তায় নামব।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেই দলকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করবেন তিনি।
বিধানসভায় বড় ধাক্কা
২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের আসন ছিল ২১৫টি। এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ৮০-তে। অন্যদিকে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে। সেখানে বিজেপি নেতা ও তার সাবেক সহযোগী শুভেন্দ অধিকারীর কাছে ১৩ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন তিনি। এর আগে ২০২১ সালেও নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু।
এ নির্বাচনের আগে মমতার ভাতিজা ও তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায় দলের নেতৃত্বে নতুন কাঠামো আনার চেষ্টা করছিলেন। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির বদলে পারফরম্যান্সভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু ভরাডুবির ফলে সেই পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
দলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতা নির্বাচনে হেরেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শশী পাঁজা, অরূপ বিশ্বাস, সুজিত বসু ও ব্রাত্য বসু।
দলে বাড়ছে অসন্তোষ
নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ফল ঘোষণার দুই দিন পর কলকাতার কালীঘাটের বাসভবনে নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করেন মমতা। সেখানে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল ও নেতাদের মনোবল ধরে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ১০ জন বিধায়ক ওই বৈঠকে যাননি।
তৃণমূলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘দলকে এক রাখতে মমতা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছয় মাস বা এক বছর পর কতজন নেতা পাশে থাকবেন, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
সহিংসতা ও মামলার শঙ্কা
নির্বাচনের ফলের পর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে। বুধবার রাতে কলকাতার কাছে মধ্যমগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর সহকারী চন্দ্রনাথ রথ গুলিতে নিহত হন। বিজেপি এ ঘটনার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করছে।
এ ঘটনায় রাজ্য পুলিশের বদলে সিবিআই তদন্ত দাবি করেছে তৃণমূল, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তৃণমূলের আশঙ্কা, বিজেপি সরকার গঠনের পর দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হতে পারে। বিজেপি ইতোমধ্যে তৃণমূল সরকারের ‘দুর্নীতি ও অত্যাচার’ নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে।
মমতা তার বিধায়কদের বলেছেন, ‘আমাদের আইনি টিম আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিজেপি আরও মামলা দেবে।’
বর্তমানে তৃণমূলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা কয়লা পাচারসহ বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার নজরদারিতে রয়েছেন। যদিও এসব মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করে আসছে তৃণমূল। তবে এখন দলটির আশঙ্কা, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তদন্ত আরও জোরদার হবে।
সংগঠনে ভাঙনের ইঙ্গিত
এ নির্বাচনে বিজেপির ভোট বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশে। বিপরীতে তৃণমূলের ভোট নেমে এসেছে ৪০ দশমিক ৮ শতাংশে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একসময় তৃণমূলের বড় শক্তি ছিল তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন। মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী কিংবা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেতারা শুধু রাজনৈতিক মুখই ছিলেন না, তারা সংগঠনের ভিতও শক্ত করেছিলেন। এখন সেই জায়গায় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
কিছুদিনের মধ্যেই রাজ্যটিতে পৌরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে। সেসব নির্বাচনে দলের প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষা হবে। তবে তৃণমূলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, ‘মমতা বিরোধী নেত্রী হিসেবে সবচেয়ে বেশি সফল ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে সেই পুরোনো রাজনৈতিক বার্তা এখন আর আগের মতো কাজ করছে না।’
তার মতে, বিজেপি সরকার ভুল করলে তবেই আবার রাজপথে আন্দোলনের সুযোগ পাবে তৃণমূল। না হলে দীর্ঘ শাসনের ‘বোঝা’ নিয়েই বিরোধী দলে টিকে থাকতে হবে দলটিকে।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল









































