
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমের নতুন সম্ভাবনা
দেশের সুস্বাদু আমের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপান বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রয়োজনীয় মান ও নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করতে পারলে এই দুই দেশের বাজার দেশের আম রপ্তানিতে এক বিরাট মাইলফলক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রপ্তানিকারক ও কৃষি কর্মকর্তারা। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মৌসুমেই এই দুটি দেশে আম রপ্তানি শুরু করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন দুটি বাজারের মধ্যে রপ্তানিকারকদের মূল নজর এবং আগ্রহ এখন মালয়েশিয়ার দিকেই বেশি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে দেশটিতে বসবাস করা বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটি। সরকারি হিসাব মতে, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। আম আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে জুনের প্রথম সপ্তাহেই মালয়েশিয়ার একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছে। সফরকালে তারা দেশের আম উৎপাদন এলাকা, আধুনিক প্যাকিং ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার এবং রপ্তানির সার্বিক প্রস্তুতি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান মনে করেন, মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিরা যদি মাথাপিছু মাত্র এক কেজি করেও আম কেনেন, তবে বাজারের আকার কতটা বিশাল হবে তা সহজেই অনুমেয়। এই কারণে বাজারটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।
অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমের দেশ জাপানও বাংলাদেশের উচ্চ মানসম্পন্ন আমের ব্যাপারে আগ্রহী প্রকাশ করেছে। তবে জাপানের বাজারটি অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও অত্যন্ত মানসম্পন্ন এবং সেখানে প্রবেশের পথে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশটি কেবল আমের স্বাদ নয়, বরং উৎপাদন পদ্ধতি, সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মতো প্রতিটি বিষয়ে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে। রপ্তানিকারকদের মতে, জাপানে আম রপ্তানির সবচেয়ে বড় শর্ত হলো কোয়ারেন্টিন ও খাদ্যনিরাপত্তা মান পূরণ করা।
বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তথ্য আদান-প্রদান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের জমা দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জাপান নতুন করে ১৬টি সম্ভাব্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বিষয়ে অতিরিক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য চেয়েছে, যেগুলো ২০২৩ সালের পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিসে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। জাপানের চাওয়া এই জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রস্তুত করতে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনাল’ বা সিএবিআই-এর সহায়তা চেয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ শাখা।
দেশের কাঁচা সবজি ও ফল রপ্তানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, জাপানিরা মাটির গুণাগুণ থেকে শুরু করে আম উৎপাদন ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত থাকতে চায়। বিষয়টি বেশ জটিল হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন জাপানের শর্তগুলো পূরণ করা অসম্ভব নয়। জাপানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট বা ভিএইচটি পদ্ধতি নিশ্চিত করা। এটি এমন একটি বিশেষ তাপপ্রয়োগ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে আমের ভেতরে থাকা ফল মাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের ডিম ও লার্ভা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়। দেশের কৃষি বিভাগ ইতিমধ্যে রাজধানীর গাবতলীতে এই ভিএইচটি প্রযুক্তির ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে। বাকি কিছু পোকা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা সমাধান করে চলতি বছরই জাপানে আম রপ্তানি শুরু করা যাবে বলে আশাবাদী কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আম রপ্তানি শুরু হয়। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। তবে এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে রপ্তানির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১ হাজার ৩২১ টনে নেমে আসে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয় এবং ২ হাজার ১৮৮ টন আম রপ্তানি করা সম্ভব হয়, যা ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি হলেও ২০২৩ সালের রেকর্ডের চেয়ে বেশ কম। তবে মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো নতুন এবং সম্ভাবনাময় বাজারগুলো ধরা সম্ভব হলে আগামী দিনে বাংলাদেশের আম রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে তা বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।
















































