বৃহস্পতিবার । জুন ২৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত খেলা ২৫ জুন ২০২৬, ৪:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার

রিয়ালের ৪৫ মিলিয়নের ‘ফ্লপ’ থেকে বিশ্ব ফুটবলের নতুন মহাতারকা ভিনিসিউস


Vini

পেলে, রোনালদো, নেইমারের পর ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করে চলেছেন এক লড়াকু সৈনিক—ভিনিসিউস জুনিয়র। অথচ কিছু বছর আগেও খোদ ব্রাজিলের মানুষ যার ট্রান্সফার ফি দেখে হেসেছিল, যাকে রিয়াল মাদ্রিদের ৪৫ মিলিয়নের এক মস্ত বড় ‘ফ্লপ’ বলে গণ্য করা হতো, আজ তিনিই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মহাতারকা। শূন্য থেকে চূড়ায় ওঠার এই অবিশ্বাস্য গল্পটাই প্রমাণ করে—কঠিন পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছা থাকলে যেকোনো বাধা জয় করা সম্ভব।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ভিনির শৈশবটা মোটেও মসৃণ ছিল না। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে বাবা-মা আর দুই ভাইকে নিয়ে থাকতে হতো দিদিমার ছোট্ট একটি বাড়িতে। কিন্তু চরম দারিদ্র্যও যার ভেতরের প্রতিভাকে কেড়ে নিতে পারেনি। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তাঁর পায়ের জাদু দেখে তাঁকে লুফে নেয় ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব ফ্লামেঙ্গো। এর ৩ বছর পর কাকার সাথে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসাটাই ছিল ভিনির জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা খেলোয়াড় হয়ে তিনি ফুটবল বিশ্বকে জানান দেন—ব্রাজিল ফুটবলে নতুন এক জাদুকরের আগমন ঘটেছে।

২০১৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ যখন রেকর্ড মূল্যে তাঁকে দলে ভেড়ায়, তখন তাঁর কাঁধে দেওয়া হয় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর রেখে যাওয়া বাম উইংয়ের শূন্যস্থান পূরণের এক কঠিন দায়িত্ব। কিন্তু শুরুতেই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর আকাশচুম্বী চাপ আর শিশুসুলভ সব গোল মিসের কারণে সমালোচকদের চরম ট্রোলের শিকার হন ভিনি। মাঠের পারফরম্যান্স এতটাই হতাশাজনক ছিল যে, এক চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ম্যাচের হাফটাইমে সতীর্থ করিম বেনজেমাও তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে অন্য সতীর্থকে বলেছিলেন, “ওকে পাস দিও না, ও আমাদের বিপক্ষে খেলছে।”

Vini

সমালোচনার তীব্র তীরেও ভিনি দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। ২০২১ সালে রিয়ালের ডাগআউটে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির আগমন যেন ভিনির ক্যারিয়ারে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। আনচেলত্তির জাদুকরী ছোঁয়ায় ঘষে-মেজে হীরা বনে যান ভিনি। নিজের গতি, চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং আর নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে নিন্দুকদের মুখে কুলুপ এঁটে দেন এই উইঙ্গার। ২০২২ ও ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে মহামূল্যবান গোল করে রিয়ালকে ইউরোপ সেরার মুকুট জেতান তিনি। তাঁর এই অবিশ্বাস্য উত্থানে মুগ্ধ হয়ে একসময়ের সমালোচক করিম বেনজেমাও নিজের ভুল স্বীকার করে ভিনিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

মাঠে পারফর্ম করে যখন ভিনিসিউসকে কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছিল না, তখন প্রতিপক্ষের গ্যালারি থেকে তাঁর প্রতি ধেয়ে আসে বর্ণবাদের নিকৃষ্টতম সব গালিগালাজ। গায়ের রঙের কারণে একের পর এক ম্যাচে মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়লেও, সেই অবমাননা ও মানসিক অত্যাচারকে তিনি বানিয়েছেন নিজের এগিয়ে যাওয়ার জ্বালানি। ভ্যালেন্সিয়ার মাঠে বর্ণবাদের শিকার হয়ে লাল কার্ড দেখার পর, পরের ম্যাচেই জোড়া গোল করে সেই প্রতিপক্ষের সামনেই আইকনিক উদযাপনে মাঠেই জবাব দেন তিনি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ফুটবল বিশ্বে এখন অন্যতম শক্ত কণ্ঠস্বর ভিনিসিউস জুনিয়র।

সেরা ফিফা পুরুষ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয়ী এই উইঙ্গার এখন শুধু ক্লাবেরই সেরা নন, বরং চোটাক্রান্ত নেইমারের অনুপস্থিতিতে সেলেসাওদেরও প্রধান কান্ডারী। ২০২৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিলের আক্রমণভাগের পুরো চাপ এখন তাঁর কাঁধে। রিয়ালের বিখ্যাত ৭ নম্বর জার্সি গায়ে জড়ানো ভিনি এখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সমস্ত বাধা পেরিয়ে ভিনিসিউস জুনিয়র আজ এক গ্লোবাল সুপারস্টার, যিনি কোটি ফুটবল ভক্তের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস