ম্যাচটা এশিয়া কাপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ দল টি২০ র্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয় ভারত, ১০ দিন ধরে যারা ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলছে। তাদের সামনে পেলে খেলাটা বরাবরই খুলে যায় মাশরাফিদের। নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দিতে টাইগারদের কারো মধ্যে কোনো কার্পণ্য থাকে না। আজ এশিয়া কাপের ফাইনালকে সামনে রেখে তাই টগবগ করে ফুটছে ১৬ কোটি জনতা!
পাকিস্তানকে হারানোর পর থেকেই ট্রফির সঙ্গে মধুচন্দ্রিমার স্বপ্ন দেখা শুরু এ দেশের ক্রিকেট ‘রোমান্টিক’দের। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হোক বা না হোক— চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে থাকতে কম ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না টাইগারভক্তদের। ঘটেছে টিকিট না পাওয়ায় ব্যাংক ভাংচুর আর টিকিট ছিনতাইয়ের মতো আবেগমথিত অপরাধও! পণ্ডিতরা পুনর্বিবেচনা করতে পারেন, সত্যিকারের ‘ইট ক্রিকেট, ড্রিংক ক্রিকেট, স্লিপ ক্রিকেট’-এর দেশ আসলে কোনটা— ভারত না বাংলাদেশ? হার্ষা ভোগলে যখন চোস্ত ইংরেজিতে বলেন, ‘নো বডি ব্যাকস দেয়ার টিম লাইক বাংলাদেশী ফ্যানস’— তখন একটা ব্যাপার পরিষ্কার, শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আজ ২৫ হাজার জনতার অসম্ভবের স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় এনে দেয়ার লড়াই মাশরাফিদের।
অথচ শুক্র-শনি ছুটি কাটিয়ে রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মব্যস্ত দিন। কিন্তু মিরপুরের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সামনে গতকাল টিকিটপ্রত্যাশীদের লাইনের দৈর্ঘ্য মাপলে, কাজের প্রতি বাঙালির বরাবরের বিশ্বস্ততায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে যেকোনো ভিনদেশীর। সব জায়গাতেই এক রব— ‘টিকিট চাই, টিকিট চাই’। এমনকি টিকিটের জন্য স্বয়ং স্বাগতিক শিবির থেকে অনুরোধ গেছে ধোনিদের শিবিরে। ফাইনালের আগে গতকালের সংবাদ সম্মেলনেও উঠে আসে টিকিটের প্রসঙ্গ। বাকি সব প্রশ্নের জবাবে মাশরাফির চোখ থেকে আত্মবিশ্বাসের স্ফুরণ ফুটে বের হলেও এ যাত্রায় তিনি হতাশ— ‘মাত্র পাঁচটা টিকিট পেয়েছি।’ স্বয়ং বাংলাদেশ অধিনায়কই যদি মাত্র পাঁচটি টিকিট পেয়ে থাকেন, তাহলে বাকিদের প্রসঙ্গ তুলে রাখাই উত্তম।
গত ৭২ ঘণ্টাজুড়ে বাংলাদেশে আর কোনো আলোচনা নেই, শুধু এ ম্যাচটা ঘিরে আবেগের লাভাস্রোতকে হূদয়ের জ্বালামুখ দিয়ে বের করে দেয়া ছাড়া। গতকাল জুমাবার থাকায় মসজিদে প্রার্থনা চলেছে মাশরাফিদের জন্য। চার বছর আগের সেই ফাইনালে শিরোপার অনেক কাছে এসেও ছিটকে পড়তে হয়। সাকিবের বুকে মুখ লুকিয়ে মুশফিকের কান্নার সেই ছবিটা চিরদিনই বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বিষণ্ন্ন প্রতিচ্ছবি। সেবারের মতো এবারো শুধু আবেগ দিয়ে ট্রফি জিততে মরিয়া ১৬ কোটি ভক্তকুল। তাদের এই আবেগের ভার বহন করছেন যারা, সেই মাশরাফি-সাকিব-তামিমরা কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। তাই এবার আর আবেগের জোয়ারে না ভেসে ফাইনালের আগের দিন স্বাগতিক শিবির সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ টলটলে জলের মতোই শান্ত। ফাইনালকে আর অন্যসব ম্যাচের মতোই দেখছেন মাশরাফি, ‘আবেগ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কারণ আমরা এ রকম সুযোগ সবসময় পাই না। তার পর আবার দেশের মাটিতে খেলা। এটাকে আর দশটা ম্যাচের মতো নেয়া সহজ নয় আমাদের জন্য। তার পরও ছেলেরা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। এসব আসলে আমাদের ভাবার বিষয় নয়। পেশাদার হিসেবে আমাদের শুধু ম্যাচ নিয়েই ভাবা উচিত। টুর্নামেন্টের আগে আমরা চেয়েছিলাম আগের এশিয়া কাপে যেভাবে খেলেছি তার থেকে উন্নতি করা। গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আমরা কিছু ম্যাচ জিতেছি; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, খুব বড় দল হয়ে গেছি। আমরা আসলে এ ম্যাচকে অন্য সব ম্যাচের মতোই দেখছি। নিজেদের সেরাটা খেলতে চাই। গত তিন ম্যাচে যেভাবে খেলেছি, সেভাবেই খেলতে চাই।’
আগের তিনটি ম্যাচ জিতে এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ। তার মানে মাশরাফি আকার-ইঙ্গিতে ফাইনাল জেতার ইচ্ছেটাও বুঝিয়ে দিলেন। কিন্তু কাগজ-কলমের হিসাব বলছে, ফাইনালটা টি২০ র্যাংকিংয়ের ‘এক’ আর ‘দশ’-এর লড়াই। তার ওপর রাউন্ড রবিন লিগে সবগুলো ম্যাচ জিতে ফাইনালে ভারত, যাদের কাছে শৃঙ্খলাই সাফল্যের পূর্বশর্ত। কিন্তু গতকালের সংবাদ সম্মেলনে শৃঙ্খলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংবাদ সম্মেলনের জন্য নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই হাজির হন ভারতের টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা তখনো আসেননি। কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিকের কাছে তিনি স্বীকার করে নেন, প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারত ৪৫ রানে জিতলেও চাপে ছিল তার দল। ফাইনাল ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় তাসকিন আর ধোনির একটি বিতর্কিত ছবি প্রসঙ্গ তোলার চেষ্টা করেছিলেন এক ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মী। তাকে মাঝপথে থামিয়ে শাস্ত্রীর উক্তি, ‘সংবাদপত্র পড়ি না। আপনারা পড়ুন। আমাদের কাজ শুধু ক্রিকেট খেলা।’
ভারতের জন্য না হলেও, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। প্রথমবারের মতো বড় কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ের হাতছানি! তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মানতে রাজি নন মাশরাফি। নিজের ক্যারিয়ারের প্রসঙ্গ টেনে স্বাগতিক অধিনায়ক বুঝিয়ে দেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। হ্যাঁ, এটা অবশ্যই অন্যতম বড় ম্যাচ। তবে তুলনা করলে ওই ম্যাচটা আরো বড় ছিল।’
ওয়ানডে বিশ্বকাপ বলেই গত বছরের সে ম্যাচ এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে মাশরাফির কাছে। ভারতের কাছে আম্পায়ারিং বিতর্কে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরেছিল বাংলাদেশ। কয়েক মাসের ব্যবধানে সে ম্যাচে হারের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ এসেছিল স্বাগতিকদের সামনে। কিন্তু মাশরাফির অভিধানে ‘প্রতিশোধ’ শব্দটার কোনো স্থান নেই, ‘দলকে উজ্জীবিত করতে প্রতিশোধের কথা বলতে হবে কেন। সত্যি বলতে মেলবোর্নের ওই ম্যাচের রেশ নেই আমাদের মধ্যে।’ মাশরাফির মতে, ফাইনালটা ‘সম্পূর্ণ নতুন ম্যাচ’— ‘জিতলে ভালো লাগবে না জিতলে কিছুই না। তবে এ টুর্নামেন্ট আমাদের টি২০তে উঠে আসার বার্তা।’
১৯৮৬ সালে এশিয়া কাপ দিয়েই ওয়ানডে অভিষেক বাংলাদেশের। ৩০ বছর পর এবার ইতিহাস গড়ার ক্যানভাসের নামও এশিয়া কাপ! প্রতিপক্ষ দলটাও টাইগার শিবিরের জ্বলে ওঠার রসদ— ধোনির ভারত। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি প্রথম বল থেকেই থাকবেন গ্যালারিতে, সঙ্গে তার মন্ত্রিপরিষদ বহর। এটা কে না জানে, গ্যালারিতে ক্রিকেটভক্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা মানেই মাশরাফিদের কাঁধে বাড়তি প্রেরণার পাশাপাশি গুরুদায়িত্ব— ম্যাচটা জিততে হবে যেকোনো মূল্যে! ফাইনালে উত্তাপ আর ভক্তকুলের আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে মাশরাফির বলা ‘না জিতলে কিছুই না’— কথাটা তাই মিথ্যা! হারলেও তো শ্রীলংকা, পাকিস্তানকে টপকে এশিয়ার দ্বিতীয় সেরা দল! আর জিতলেই মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। বণিকবার্তা।









































