অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুটোতেই গভীর সংকটে কোরিয়া

অর্থনীতির দুঃসময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক সংকট

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হে’কে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক সংকট সে দেশের অর্থনীতির বিপদ ঘনীভূত করবে। এমনিতে সংকটাপন্ন অর্থনীতি উদ্ধারের প্রক্রিয়া এ বিপর্যয়ের ফলে আরো পিছিয়ে পড়বে।

চলমান রাজনৈতিক সংকট এসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির মন্দতম সময়ে। সে দেশের বৃহত্তম কোম্পানি স্যামসাংয়ের গর্বের নোট ৭ স্মার্টফোন প্রতিষ্ঠানটিকে গভীর বিপর্যয়ে টেনে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি হানজিন দেউলিয়া হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম রিটেইলার লোট্টে গ্রুপ কর ফাঁকি, ঘুষ প্রদান ও তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে ক্ষমা চেয়েছে। সার্বিকভাবে দেশজ রফতানি কমছে। পরিবারগুলোর ঋণ বাড়ছে।

বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে তুলতে দক্ষিণ কোরিয়ায় এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শক্ত নেতৃত্বের। এমন সময়েই কিনা অর্থনৈতিক প্রভাবচর্চার সুযোগ দেয়ার অভিযোগে প্রেসিডেন্ট পার্কের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী দলগুলো প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও পদত্যাগ দাবি করেছে। প্রেসিডেন্টের দল সেনুরি পার্টির নেতারাই রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে অন্যান্য দল নিয়ে জোট সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। গতকাল এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হের গ্রহণযোগ্যতা ১০ শতাংশে নেমেছে। ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ তার পদত্যাগ ও অভিশংসনের পক্ষে মত দিয়েছে। চারদিন আগের গ্যালাপ জরিপে প্রেসিডেন্টের ১৭  শতাংশ গ্রহণযোগ্যতা দেখা যায়।

বিপর্যয় সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হহে গতকাল মন্ত্রিসভার তিনটি পদে রদবদল ঘটিয়েছেন। রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট তার প্রধানমন্ত্রী পদে উদারপন্থী রাজনীতিক কিম বিয়ং জুনকে নিয়োগ দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী ও নিরাপত্তামন্ত্রী পদেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি ততক্ষণাত এক প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রিসভায় রদবদলের নিন্দা জানিয়েছে। কেলেঙ্কারি থেকে অন্যত্র মনোযোগ সরাতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে বিরোধীরা অভিযোগ করেছে।

সিউলের হোংগিক ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক জুন সুং ইন বলেছেন, অর্থনীতি যখন চাঙ্গা থাকে, তখন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে শক্ত নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সামাল দেয়া যায়। কিন্তু যখন অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে সমন্বয়ের প্রয়োজন বেশি থাকে, সে সময় নেতৃত্বের অনুপস্থিতি উদ্বেগজনক।

চলমান রাজনৈতিক সংকটে অর্থনীতির কয়েকটি বড় ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হবে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধিতে বিশ্ববাজারে যে প্রতিক্রিয়া হবে, দক্ষিণ কোরিয়া যথাসময়ে তার প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হতে পারে। জাহাজ নির্মাণ খাত পুনর্গঠনে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার বাস্তবায়নে শৈথিল্য আসতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া সরকার আগামী বছর ৩ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হের ক্ষমতাকাল শেষ হবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো স্কট স্নাইডারের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তারা জানান, করপোরেট পুনর্গঠনের মতো এজেন্ডাগুলোয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা যায়। এসব ইস্যুতে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জোর চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে আটকে আছে।

প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের বান্ধবী ছোয়ে সুন সিলকে রাষ্ট্রীয় বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছোয়ে সুন সিলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বাজেট, কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। স্যামসাংসহ বিভিন্ন কনগ্লোমারেটের কাছ থেকে তিনি নিজের পরিচালিত ফাউন্ডেশনের জন্য চাঁদা আদায় করেছেন। দক্ষিণ কোরীয় কৌঁসুলিরা গতকাল ছোয়ে সুন সিলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন। এর আগে সোমবার তাকে আটক করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিকে বেশকিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা মোকাবেলায় যেতে হচ্ছে। দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। কঠোর শ্রম আইনের কারণে স্থানীয় কোম্পানিগুলো ভুগছে। এদিকে চীনের দিক থেকে কোরীয় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তীব্র হচ্ছে। কোরীয় সরকারের ত্বরিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন এমন ইস্যুও কম নয়। হানজিনের পতন, স্যামসাংয়ের বিপর্যয়, হুন্দাই ও দাইয়ুর রুগ্ন দশা— সব বিষয়েই সরকারের সাহসী উদ্যোগ প্রয়োজন। কেননা পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত এসব কনগ্লোমারেটের নেতৃত্বেই দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।

বাজার থেকে নোট ৭ স্মার্টফোন প্রত্যাহার করতে গিয়ে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসকে ৬০০ কোটি ডলার ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ ও পরিচালন খাতের কোম্পানিগুলো হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করছে। মালিকপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় লোট্টে গ্রুপকে বেশকিছু ব্যবসায়িক উদ্যোগ পিছিয়ে দিতে হয়েছে।

পিটারসন ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের কেন্ট বয়ডস্টোনের মতে, জনপ্রিয়তা তলানির দিকে থাকলে প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে না।

চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে এরই মধ্যে ২০১৭ সালের বাজেট পর্যালোচনা ও অনুমোদনের কাজ পিছিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় পার্লামেন্টের শুনানিতে বাজেট পর্যালোচনার পরিবর্তে সরকারি দলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্যই বেশি হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফল এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বরে শিল্প খাতের উত্পাদন এক বছর আগের তুলনায় ২ শতাংশ কমেছে। অক্টোবরে রফতানির পরিমাণ এক বছর আগের চেয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোরীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। সিটিব্যাংক কোরিয়ার মতে, চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে। সূত্র: এপি।