cosmetics-ad

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে স্যামসাংয়ের অর্থদণ্ড বাতিল

base_1481123481-1

উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে স্যামসাং ও অ্যাপলের মধ্যে চলমান মাল্টিমিলিয়ন ডলার পেটেন্ট দ্বৈরথের হাওয়া। অ্যাপলের আইফোনের ডিজাইন নকলের অভিযোগে স্যামসাংয়ের ওপর আরোপিত ৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানার রায় বাতিল করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। এর আগে দেশটির স্থানীয় এক আদালতে স্যামসাংকে এ জরিমানার অর্থ অ্যাপলকে পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। খবর রয়টার্স।

স্যামসাংয়ের অর্থদণ্ড বাতিল করে দেয়া রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়োর বলেন, পেটেন্ট লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পণ্যে নকল করা ডিজাইনের আংশিক ব্যবহার থাকলে সবক্ষেত্রেই জরিমানা হিসেবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি করে পাওয়া মুনাফার পুরোটাই শোধ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

ইউএস সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতিরা বর্তমানে মামলাটি ওয়াশিংটনের ইউএস কোর্ট অব আপিলস ফর দ্য ফেডারেল সার্কিটে ফেরত পাঠিয়েছেন। সেখানেই স্যামসাংয়ের জরিমানার প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ হবে। তবে এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নিম্ন আদালত ও জুরিদের জন্য জরিমানার অর্থ নির্ধারণের বিষয়ে কোনো পদ্ধতিমূলক দিকনির্দেশনা দেননি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা।

এ বিষয়ে অ্যাপলের মুখপাত্র জোশ রোজেনস্টক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, এ মামলায় নিম্ন আদালতের রায় থেকে চৌর্যবৃত্তি যে ভালো কিছু, সে ইঙ্গিতই আবারো প্রকাশ করা হবে।’

অন্যদিকে রয়টার্সে পাঠানো এক বিবৃতিতে স্যামসাং জানায়, প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করে ঘোষিত নিম্ন আদালতের ওই রায়ের ওপর সুপ্রিম কোর্টের রুল জারির বিষয়টিকে শুধু স্যামসাংয়ের জন্য নয়; বরং সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও বাজারের সুস্থ প্রতিযোগিতানির্ভর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্যই বিজয় হিসেবে গণ্য করা যায়।

স্যামসাং ও অ্যাপলের পেটেন্ট যুদ্ধ শুরু হয় ২০১১ সালে। ওই সময় স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি সিরিজসহ বেশকিছু স্মার্টফোন সিরিজে পেটেন্ট ও ট্রেডমার্কস্বত্ব লঙ্ঘন এবং আইফোনের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত আকার নকলের অভিযোগ আনে অ্যাপল। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর অন্যতম হয়ে দাঁড়ায় বিষয়টি। এ নিয়ে প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সংবাদ মাধ্যমগুলোয় নানা আলোচনা ও বাদানুবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তৈরি হয়েছে অসংখ্য ট্রল ও মিমি। এমনকি এ নিয়ে কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্রের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। শুধু বিভিন্ন মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টিই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পাওয়া পেটেন্ট মামলাগুলোর অন্যতম হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘটনাটি।

২০১২ সালে আদালতের এক রায়ে পেটেন্ট লঙ্ঘনের দায়ে স্যামসাংকে ৯৩ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে এ জরিমানার অর্থ ৩৮ কোটি ২০ লাখ ডলার কমানো হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে জরিমানার বাকি ৫৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পুরোটাই পরিশোধ করে স্যামসাং। যদিও এ নিয়ে পরবর্তীতে আবারো আদালতের দ্বারস্থ হয় দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক ইলেকট্রনিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটি। সুপ্রিম কোর্টে করা আবেদনে স্যামসাং জানায়, আইফোনের পেটেন্ট করা গোলাকৃতির কোনাযুক্ত ফ্রন্ট ফেস, ফ্রেম এবং বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও অ্যাপ্লিকেশনের আইকনের বর্ণিল গ্রিড কপি করার জন্য আগের রায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার অতিরিক্ত জরিমানা করা হয়েছে, যা মোটেও উচিত হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার এ রায় প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। প্রসঙ্গত. স্যামসাংয়ের যেসব পণ্য নিয়ে এ তুলকালাম কাণ্ডের সূত্রপাত, ওইসব পণ্যের ওপর নির্ভর করেই স্মার্টফোন নির্মাতা হিসেবে গোটা বিশ্বে নিজের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল স্যামসাং।

বৈশ্বিক প্রযুক্তিজগতের দুই জায়ান্টের মধ্যে চলমান আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট আইনের ‘আর্টিকল অব ম্যানুফ্যাকচার’ বা উৎপাদন শর্তের ধারা। এ ধারা অনুযায়ী কোনো চূড়ান্তভাবে উৎপাদিত পণ্যে ‘ইউএস পেটেন্ট ল’ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। ধারাটির আলোচ্য বিষয় হলো, অভিযুক্ত পণ্যের পুরোটাই, নাকি অংশবিশেষের ক্ষেত্রে এ আইন অনুযায়ী জরিমানা নির্ধারণ করা হবে।

আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, এখানে যে আইনের প্রয়োগ পুরো পণ্যে না হয়ে পণ্যের অংশবিশেষে হতে পারে, সে বিষয়ে স্যামসাং, অ্যাপল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তিন পক্ষই ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলাকালে অ্যাপল আদালতে পুরনো রায় বহাল রাখার আবেদন জানিয়ে বলে, এখানে স্যামসাং পুরো পণ্যে আর্টিকল অব ম্যানুফ্যাকচারের প্রয়োগের বিপক্ষে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। অন্যদিকে বিষয়টিতে এ ধরনের কোনো প্রমাণ হাজির করার কোনো প্রয়োজনই নেই বলে আদালতে স্যামসাংয়ের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করা হয়।

রায়ে বিচারপতি সোটোমায়োর লেখেন, ‘এখানে আইনের ধারা পরিষ্কার। আর্টিকল অব ম্যানুফ্যাকচার ভোক্তার কাছে বিক্রীত পণ্য বা এর অংশবিশেষ দুটো নিয়েই আলোচনা করার মতো যথেষ্ট বিস্তৃত।’

তবে নিম্ন আদালতের জন্য জরিমানার অর্থ নিরূপণের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের জুরিদের জন্য কোনো ধরনের দিকনির্দেশনামূলক পদ্ধতি নিরূপণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। অন্যদিকে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের জরিমানা নিরূপণ বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে মিলওয়াকিভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান ফলি অ্যান্ড লার্ডনারের ডিজাইন রাইটস বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ম্যাককেন্না বলেন, অ্যাপল-স্যামসাংয়ের আইনি লড়াই তো বটেই, এ ধরনের অন্যান্য ডিজাইন পেটেন্ট মামলার ক্ষেত্রেও আমরা এক অনিশ্চিত সময়ের মুখোমুখি এসে পড়েছি। এ বিষয়ে আদালতের জরিমানার অর্থ নিরূপণের জন্য যথাযোগ্য পদ্ধতি উদ্ভাবন ও এর সীমানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এ অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আদালতি ইতিহাসে ডিজাইন পেটেন্ট-সংক্রান্ত মামলাগুলো সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার নিদর্শন বেশ কম। সুপ্রিম কোর্টে এ ধরনের মামলা গড়াল ১২০ বছরেরও বেশি সময় পর। বণিকবার্তা।