cosmetics-ad

কোরিয়া যুদ্ধের কোরীয় বিষাদ

সিউল, ১ আগষ্ট ২০১৩:

119375

‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা
কে বলে আজ তুমি নেই
তুমি আছ মন বলে তাই।’

মন বলে তুমি মারা গেছ, আবার মন বলে তুমি বেঁচে আছ। কিমের জীবনের পরাজয় এভাবেই ধরা দিয়েছিল ‘এলিজি’ (শোক) হয়ে। কিম মনে করছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের দুই কোরিয়ার যুদ্ধে তার স্বামীর জীনপ্রদীপ হয়তো নিভে গেছে। লি-হীন বিধবার জীবন অষ্টপ্রহর কষ্টে কেটেছে। কিন্তু মনপাখি মানতেই পারেনি লি তাকে না বলে মরতে পারে। মন সায় দেয় না। কিমের মন বলে লি একদিন ফিরে আসবে। এ বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রিয়তমের প্রতীক্ষায় দিনগুজার করতে থাকে কিম। দিন যাচ্ছিল এভাবেই।

কিন্তু ২০০৪ সালে একটি ফোনকল কিমের জীবনযাপনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। চীন থেকে ২০০৪ সালে কিমের কাছে একটি ফোনকল আসে। তিনি মনে করেছিলেন, তার কাছে টাকা-পয়সা চেয়ে কেউ ফোন করে থাকবেন। বিগত বছরগুলোতে এরকম অনেক ফোনকল পেয়েছিলেন তিনি। তাই ওই কলটির প্রতিও তেমন গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। কিন্তু যখনই ফোন রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেলেন, নিজেকে আর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কিম। ফোনটি যে অন্য কারও নয়, তার হারিয়ে যাওয়া স্বামীর। ফোনে স্বামীকে কিম জিজ্ঞেস করেন, ‘আসলে তুমি বেঁচে আছ?’ উত্তর আসে, হ্যাঁ, আমি জীবিত। এরপর তিনি আরও কতগুলো প্রশ্ন করেন স্বামীর দাবিদার ফোনকারীকে, যেমন অমুক-অমুককে চেন। সবগুলোর উত্তর নির্ভুলভাবে দেয়ার পরেই ফোনকারীকে চিনতে পারেন কিম।

কিন্তু যখন তারা সাক্ষাৎ করলেন, একে অপরকে তেমন একটা পরিচিত মনে হচ্ছিল না তাদের। হবেই বা কী করে, শুকিয়ে তো কৃশকায় বনে গেছেন লি, টলতে টলতে পথ চলেন। অন্যদিকে ভালোমন্দ খেয়ে বেশ মোটাসোটা হয়েছেন কিম। লি’র বিশ্বাসই হচ্ছিল না কিম তার সহধর্মিণী। কিম জানান, তিনি নাক দেখেই শনাক্ত করেছেন স্বামীকে। স্ত্রীর চেহারা সম্পর্কে রসিকতা করে লি বলেন, ‘ওকে দেখে তো মনে হচ্ছিল আগের সময়ের জমিদারণী। সব দক্ষিণ কোরীয় না খেয়ে মারা যাচ্ছে, আর আমেরিকানরা সব চাল নিয়ে যাচ্ছে, শুধু পচা আটাগুলো দিয়ে যাচ্ছে। এমন অপপ্রচার শুনে তো আমি বিশ্বাস করেছিলাম সে মারা গেছে।’ লি বলেন, ‘আমরা একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম’।

১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সইয়ের দু’দিন আগে লি সুন-সাংকে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী আটক করে। তিনি যুদ্ধশিবিরের একটি কারাগারে সাড়ে তিন বছর কাটান। এরপর তাকে উত্তর কোরিয়ার বিপজ্জনক কয়লা খনির স্থান অজিতে পাঠানো হয়। অজিতে গানপাউডার উৎপাদিত হয়। তিনি বলেন, “উত্তর কোরিয়ার জীবন ছিল কঠিন। তাই আমি আমার নিজ শহরের কথা ভাবতাম। যদিও আমি বিশ্বাস করতাম আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমি সব সময় বিশ্বাস করতাম একদিন আমি ফিরব।’

কয়েক দশক পর ২০০৪ সালে উত্তর কোরিয়ার বাইরে লোক পাঠানো ও ভেতরের প্রবেশ করানোর দালাল চক্রের একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি কিমের খবর দেন লিকে। লি বলেন, ‘সে আমাকে বলে যে কিম ইউন-হায়ে ও আমার ছেলে চীনে রয়েছে, তারা অনেক টাকা পয়সার মালিক। টাকা পয়সা নিয়ে ভালো জীবনযাপনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় (নিজ শহরে) ফিরে যাওয়া উচিত।’ এভাবেই চীন হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরা হয় লি’র। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা কেবল ‘লি-কিম’ কাহিনীতেই সীমাবদ্ধ নয়। কোরিয়া যুদ্ধ-পরবর্তী কোরীয়দের এ বিষাদগাথা এখনও তাড়া করে ফেরে দুই কোরিয়ায়। সুত্রঃ যুগান্তর