sentbe-top

মাহাথির মোহাম্মদ ও আধুনিক মালয়েশিয়া

malaysia-mahathir৯৩ বছর বয়সী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। বিশ্বের সবচাইতে বয়স্ক রাজনীতিবিদ। দেশকে দুর্নীতি থেকে রক্ষা করতে আবারও ফিরে এসেছেন মাহাথির। বিশ্বজুড়ে তুমুল আগ্রহের সঞ্চার হয়েছে মালয়েশিয়ার রাজনীতির এই প্রবাদ পুরুষকে ঘিরে।

১৯২৫ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ কলোনিভুক্ত মালয়ের কেদাহ অঞ্চলের সেতার নামক গ্রামে সাধারণ এক স্কুল শিক্ষকের ঘরে জন্ম নেন মাহাথির। তার আগে যে তিনজন প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া শাসন করেছেন তারা সবাই ছিলেন সমাজের অভিজাত শ্রেণির। সেই হিসেবে মাহাথির বেশ সাধারণ ঘর থেকেই উঠে এসেছেন।

শিক্ষাজীবনের শুরুতে মালয়ের একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হন তিনি। বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করে এগিয়ে নেন শিক্ষা জীবন। ইংরেজির শিক্ষক বাবার সংস্পর্শে থেকেই এই ভাষায় জাদুকরী দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন মেডিকেল কলেজে। ১৯৪৭ তিনি সিঙ্গাপুরের কিং অ্যাডওয়ার্ড সেভেন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। মাহাথিরসহ মাত্র ৭ জন মালয় শিক্ষার্থী তখন সেখানে পড়াশোনা করছিলেন।

এমবিবিএস পাসের পর মালয়েশিয়ার একটি সরকারি হাসপাতালে যোগ দেন মাহাথির। সরকারি বিধি নিষেধের ওপর বিরক্ত হয়েই কি-না, কিছুদিন পর নিজেই খুলে বসেন প্রাইভেট ক্লিনিক। মালয় বংশোদ্ভূত কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন একমাত্র হাসপাতাল ছিল এটি। অনেকে মনে করেন, শুধু রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্যই সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন মাহাথির। রাজনৈতিক দল ইউএমএনও থেকে মালয় প্রাদেশিক রাজ্যের শীর্ষ পদে নিয়োগ পান।

চিকিৎসক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান মাহাথির। বাড়তে থাকে তার গণসম্পৃক্ততা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের একদম কাছাকাছি থাকতেন এই নেতা। এই বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি।

১৯৬৪ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাহাথির। পুনরায় নির্বাচিত হন ১৯৬৯ সালেও। নিজ দলের প্রধান এবং মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টেংকু আবদুর রহমানের সঙ্গে মতো বিরোধের জেরে ৩ বছর রাজনীতি থেকে অবসরে ছিলেন। ১৯৬৯’র ৩০ মে সংঘটিত চীনা ও মালয়ীদের মধ্যকার দাঙ্গার জন্য টেংকু আবদুর রহমানকে দায়ী করেছিলেন মাহাথির।

অবশেষে, ১৯৭২ সালে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসেন মাহাথির। সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে জয় লাভের পর শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। প্রধানমন্ত্রী তুন হোসেন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৭৬ সালে।

১৯৮১ সালের নির্বাচনে দেশটির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ। দীর্ঘ ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে আসেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ।

তার মেধা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। উন্নয়নমূলক নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে বদলে দেন মালয়েশিয়াকে। তাই তাকে বলা হয়, আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক। ক্ষমতায় আসার পর একের পর পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নও করেছেন সেগুলো। দেশটির ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মসূচিও তার ঘোষণা করা ছিল। মাহাথির শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিক। মালয়েশিয়ার সব মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি।

মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহন করে। এই নীতি চালু হয় মাহাথিরের আমল থেকে। আশির দশকে গৃহীত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন তিনি। ফলাফল এই যে, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে উল্টো আরও ৮ লাখ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া।

একই বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতেই ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, সমুদ্র থেকে ৬,৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার, অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি, একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, হাইওয়ে নির্মাণসহ তার অসংখ্য উদ্যোগ সফল হয়েছে।

১৯৯০ সালেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশের বেশি। ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডোলার।

অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর তালিকায় তলানিতে থাকা মালয়েশিয়াকে নিয়ে আসেন ১৪তম স্থানে। মাহাথির ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। কর্মীদের যা করতে বলেছেন তা নিজে করেও দেখিয়েছেন। সরকারি কর্মীরা যেন ঠিক সময়ে অফিসে আসেন সেজন্য নিজেও ঠিক সময়ে অফিসে আসতেন। টাইম ম্যাগাজিন একবার তার অফিসে আসার সময় রেকর্ড করেছিল। পরপর পাঁচদিন মাহাথিরের অফিসে প্রবেশের সময় ছিল সকাল ৭:৫৭, ৭:৫৬, ৭:৫৭, ৭:৫৯, ৭:৫৭ মিনিটে।

সিঙ্গাপুরে মেডিকেলে পড়ার সময় মাহাথিরের সহপাঠী ছিলেন সিতি হাসমাহ। এই সিতিকেই নিজের জীবন সঙ্গী করে এতটা পথ হেঁটেছেন।

রাজনীতিতে ফিরে মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিতের পর, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিলেন মাহাথির মোহাম্মদ।
বিগত দিনে মাহাথিরের রাষ্ট্র পরিচালনা এবং উন্নয়নের মন্ত্র কেবল নিজের দেশের ক্ষেত্রেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। ‘আমাকে দশজন যুবক দাও, আমি মালয়ীদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বজয় করে ফেলব’- এমনি আদর্শিক চেতনা নিয়ে দারিদ্র্যের তলানিতে অবস্থান করা মালয়েশিয়াকে তুলে এনেছেন উন্নয়ন আর আধুনিকতার শীর্ষে। আপাদমস্তক বাস্তববাদী এবং দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ডা. মাহাথির মোহাম্মদ আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবীর শাসকদের জন্য একটি অনুকরণীয় আদর্শ।

১৯৬৯ সালে তিনি একটি বই লেখেন। পরে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই ৫৫ বছর বয়সে ডা. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একটানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ৭৭ বছর বয়সে ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে বিদায় নেন।

sentbe-adসম্প্রতি সিএনএনের একটি সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তার দেশ গড়ার গল্প। মাহাথির বলেন, যখন স্বেচ্ছায় অবসরে গেলাম আমি চিন্তা করেছিলাম আমার চারপাশ এবং আমার পরিবারকে নিয়ে একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় সময় কাটাতে পারবো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার অবসরে যাওয়ার পরেই পরবর্তীজন নতুন পরিকল্পনা করেন, যেটাকে আমার ভালো মনে হয়নি সেজন্যই আবার ফিরে আসা। বিশেষ করে বলতে গেলে আমার শুরু করা সমস্ত কিছুকেই তারা এড়িয়ে যেত লাগলো। এ কারণে অনেকেই অখুশি হয়েছিল। তারা প্রায়ই আমার কাছে আসত এবং বলত ‘দয়া করে কিছু একটা করুন, কিছু একটা করুন।’

আমি স্বৈরশাসক ছিলাম না। জনগণ দ্বারা পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছিলাম, এবং সবচেয়ে বড় কথা কোনো স্বৈরশাসকই কখনো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে না, অন্যদিকে আমি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করি- দেশের জন্য কাজ করা এবং একে ভালো কিছু দেয়ার সুযোগ গ্রহণ করাটা খুবই স্বস্তিদায়ক। এটা এ জন্য নয় যে আপনি টাকা কামাচ্ছেন বরং এটা এজন্য যে আপনাকে আপনার কাজে সন্তুষ্ট রাখছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি এবং দেখেছি তারা খুবই ভালো করছে। তবে মালায়শিয়া কেন নয়? সেজন্য এটা একটি বিবেচ্য বিষয় যে, আমাদের বিবেচনা করতে হবে আমাদের সম্পদকে, আমাদের সামর্থকে, আমাদের অবস্থাকে এবং সামনে আসন্ন পরিবর্তনকে যাতে আমরা আমাদের দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবদান রাখতে পারি।

এতটা অনুশোচনা নেই কিন্তু আমি অনুভব করি যে, এই দেশটি বিভিন্ন বর্ণের জাতির সমষ্টি। আপনি এটাকে পরিবর্তন করতে পারবেন না, ধনী-গরিবের মধ্যে, বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকাকে পছন্দ করি না কারণ এটা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

এটা নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যাতে এ রকম বৈষম্য বিলুপ্ত হয় এবং এক হয়ে দেশটির সব গোত্রই এ দেশের সব সম্পদ সমানভাবে ভোগ করতে পারবে। আমার কিছুটা সফলতা রয়েছে কিন্তু বৃহৎ অর্থে আমি ব্যর্থ।

‘আমরা সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে বিশ্বস্ত কোনো কর্মকর্তা পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাইরে থেকে আমরা বুঝতে পারছিলাম, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে গোটা প্রশাসন। কিন্তু পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ তা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসার আগে বুঝতে পারিনি। সরকার যাদের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেবে, সেই শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই দুর্নীতিগ্রস্ত।’

মাহাথিরের পূর্বসূরী নাজিব রাজাক জনগণের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাকে এমন লোকজনকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে যারা দুর্নীতির কারণে বিচারের মুখোমুখি হবার যোগ্য। এটা ভীষণ কঠিন একটা কাজ। কারণ যাদের আপনি বিশ্বাস করতে পারেন না, তাদের যে দায়িত্ব দেবেন তা তারা আদৌ ঠিকভাবে করবে কি-না সেই সংশয় থেকে বের হওয়া কঠিন।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ সূচক অনুসারে মালয়েশিয়া বিশ্বের ৬২তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। মাহাথির বলেন, ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা তাদের অর্জিত বিপুল অর্থ নিজেরা এবং স্ত্রী-সন্তানদের বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, বিদেশভ্রমণ, কিংবা দেশের বাইরের ব্যাংকে জমা করার সুযোগ পেয়েছেন। সরকার তাদের বিন্দুমাত্র বাধা দেয়নি।’ মার্কিন এই গণমাধ্যমকে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যতদিন সুযোগ পাই জনগণের সেবা করে যাব। আমার ইচ্ছা যেন আমি আরো বেশি কিছু করতে পারি।

লেখক- আহমাদুল কবির, সৌজন্যে- জাগো নিউজ

sentbe-top