শনিবার । মার্চ ২১, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:১৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

নতুন বছরে অপ্রয়োজনীয় খরচের ভিড়ে নিজের আর্থিক মানচিত্র বদলানোর কৌশল


Money management

নতুন বছর মানেই নতুন পরিকল্পনা, নতুন করে পথচলা। জীবনের অন্যান্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে আমাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো অর্থকড়ি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর আধুনিক জীবনের চাকচিক্যের মাঝে মাস শেষে পকেটে টান পড়া এখন খুব সাধারণ ঘটনা। তবে সামান্য কিছু অভ্যাস পরিবর্তন আর সচেতন কৌশল অবলম্বন করলে নতুন বছরে আপনিও পেতে পারেন আর্থিক স্বস্তি। 

খরচ কমানো ও সঞ্চয় বাড়ানোর কার্যকরী কৌশলগুলো জেনে নেওয়া যাক।

সাশ্রয়ী জীবন গড়তে যা করবেন

  • বছরের শুরুতেই বাজেট করুন: নতুন বছরের শুরুতে মাসওয়ারি বাজেট ঠিক করে ফেলা উচিত। যেমন বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রতিটি খাতে কত খরচ হবে, তা আগেই লিখে ফেলুন। লিখিত বাজেট থাকলে হঠাৎ খরচে লাগাম টানা সহজ হয়। 
  • বাজেট হোক ‘৫০-৩০-২০’ নিয়মে: আপনার মাসিক আয়কে তিন ভাগে ভাগ করুন। আয়ের ৫০ শতাংশ রাখুন মৌলিক প্রয়োজনে (বাসা ভাড়া, খাবার), ৩০ শতাংশ রাখুন শখ বা বিনোদনে এবং বাকি ২০ শতাংশ শুরুতেই সঞ্চয় বা ঋণের কিস্তি মেটানোর জন্য সরিয়ে রাখুন।
  • জরুরি তহবিল গঠন: জীবন অনিশ্চিত। তাই যেকোনো আপদকালীন সময়ের জন্য অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের খরচের সমান টাকা একটি আলাদা সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে জমানোর চেষ্টা শুরু করুন। এটি আপনাকে মানসিক নিরাপত্তা দেবে। 
  • প্রয়োজন আর শখ আলাদা করুন: আপনার প্রয়োজন আর শখের বিষয়টি আলাদা করে রাখুন। এতে খরচ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। যেমন চাল-ডাল, বাসাভাড়া বা সন্তানের পড়াশোনা প্রয়োজনীয় খরচ হিসেবে বিবেচনায় রাখুন। আর নতুন ফোন বা ব্র্যান্ডের পোশাক কেনা হলো শখের খরচ। বাজেটে প্রথমে প্রয়োজনীয় খাত পূরণ করুন, পরে শখের খরচের কথা ভাবুন।
  • কেনাকাটায় ‘৪৮ ঘণ্টা’ ফর্মুলা: অনলাইনে বা শপিং মলে কোনো কিছু দেখে পছন্দ হলেই কিনবেন না। ঝোঁকের মাথায় কেনাকাটা এড়াতে অন্তত দুই দিন অপেক্ষা করুন। দেখবেন, অনেক ক্ষেত্রেই সেই জিনিসের প্রয়োজনীয়তা আর অনুভব করছেন না।
  • বিনিয়োগের মানসিকতা: শুধু টাকা জমিয়ে রাখলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে তার মান কমে যায়। তাই সঞ্চিত টাকা জমি, সঞ্চয়পত্র বা বিশ্বস্ত কোনো খাতে বিনিয়োগ করার অভ্যাস করুন, যাতে আপনার টাকা আপনার জন্যই কাজ করে।
  •  সঞ্চয় সবার আগে: একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মাসের শুরুতেই পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয়ে রাখবেন। বেতন পাওয়ার দিনই আলাদা হিসাবে রাখলে খরচ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। একসময় দেখবেন, বেশ কিছু টাকা সঞ্চয় হয়ে গেছে। টাকা থাকলে সাহস বাড়ে।
  • বেশি সুদের ঋণ বা লোন আগে শোধ: বেশি সুদের ঋণ আগে শোধ করলে চাপ কমে যায়। যেমন একসঙ্গে মুঠোফোন ও ফ্রিজ কেনার ঋণের কিস্তি চলছে। কোনটিতে সুদ বেশি, সেটি আগে শোধের পরিকল্পনা করলে মোট খরচ কমে।
  • মাস শেষে বাজেট মিলিয়ে দেখুন: যদি দেখেন খাবার খাতে বরাদ্দ ছাড়িয়েছে, পরের মাসে সেখানে নিয়ন্ত্রণ আনুন। নিয়মিত পর্যালোচনাই বাজেট কার্যকর রাখে।

আর্থিক বিপর্যয় এড়াতে যা করবেন না

  • ক্রেডিট কার্ডের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: ক্রেডিট কার্ডে খরচ করার সময় আমরা নগদ টাকার অভাব বুঝতে পারি না। পকেটে টাকা নেই কিন্তু কার্ডে লিমিট আছে এই অজুহাতে ক্ষমতার বাইরে খরচ করা থেকে বিরত থাকুন। ঋণের বোঝা একবার বাড়লে তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
  • অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন: আমরা অনেকেই নেটফ্লিক্স, হইচই বা বিভিন্ন অ্যাপের মেম্বারশিপ নিয়ে রাখি যা হয়তো মাসে একবারও দেখা হয় না। এই ছোট ছোট অটো-পেমেন্টগুলো প্রতি মাসে আপনার পকেট থেকে নীরবে অনেক টাকা কেড়ে নেয়। যা ব্যবহার করেন না, তা আজই বাতিল করুন।
  • অন্যকে দেখে জীবনযাপন: বন্ধু বা আত্মীয়রা দামী ফোন কিনছে বা দামী রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে দেখে নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে তা অনুকরণ করতে যাবেন না। অন্যের লাইফস্টাইল ফলো করতে গিয়ে ঋণের জালে জড়ানো হবে বছরের সবচেয়ে বড় ভুল।
  • হিসাব না রাখা: ‘টাকা কোথায় গেল বুঝতে পারলাম না’ এই আফসোস বন্ধ করতে হবে। প্রতিদিনের ছোট থেকে ছোট খরচগুলোও লিখে রাখুন। মাসের শেষে যখন দেখবেন অকারণে কত টাকা খরচ হয়েছে, তখন পরের মাসে আপনি সচেতন হতে পারবেন।
  • অতিরিক্ত বাইরে খাওয়া: শখের বসে মাঝে মাঝে বাইরে খাওয়া ঠিক আছে কিন্তু নিয়মিত রেস্টুরেন্টের খাবার বা অনলাইন ডেলিভারি আপনার বাজেটের বড় শত্রু। বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার শুধু শরীর নয়, মানিব্যাগকেও সুস্থ রাখে।

নতুন বছরের এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্বাধীনতা এনে দিতে পারে। মনে রাখবেন, উপার্জনের চেয়ে বড় শিল্প হলো সেই উপার্জনকে সঠিক উপায়ে ধরে রাখা এবং বাড়ানো।