
ছবি: সংগৃহীত
উন্নত জীবনের আশায়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি পাড়ি জমান প্রবাসে। তাদের অনেকের চোখে প্রবাস মানেই নিশ্চিত আয়, স্থায়ী চাকরি ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে আসছে এক ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতা। স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় পৌঁছে অনেক প্রবাসীকেই প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে জীবন-মরণের কঠিন সংগ্রামের সঙ্গে।
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক নির্মাণ, শিল্প, বাগান, বন্দর ও সেবা খাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্পাঞ্চল—সবখানেই রয়েছে তাদের শ্রমের ছাপ। একই সঙ্গে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিচ্ছে।
প্রবাসে যাওয়ার আগে অধিকাংশ শ্রমিকের প্রত্যাশা প্রায় এক—ভালো বেতন, বৈধ কাগজপত্র, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ ও নিরাপদ জীবন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক প্রবাসীই পাচ্ছেন তার উল্টো চিত্র। কলিং ভিসা বা তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’র আশ্বাসে এসে অনেকে কাজই পাচ্ছেন না। কেউ মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ চুক্তির তুলনায় অনেক কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
দালালচক্রের প্রতারণা প্রবাসীদের সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। ভিসা ও কাগজপত্রে সামান্য ভুল, নিয়োগকর্তার অবহেলা কিংবা দালালের অসাধু কারসাজিতে অনেকেই অজান্তেই অবৈধ অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন। এর পরিণতিতে আটক, জরিমানা বা দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি প্রতিনিয়ত তাড়া করছে তাদের।
কাজ হারানো, হঠাৎ চাকরি ছাঁটাই, বেতন কাটছাঁট—এসব ঘটনায় প্রবাসীদের জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা অসাধু চক্রের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে পুরো কমিউনিটির ওপর, তৈরি হচ্ছে সামাজিক চাপ ও মানসিক আতঙ্ক।
অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল সবাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের সচেতনতা কার্যক্রম ও সেবায় কিছু অগ্রগতি হলেও মাঠপর্যায়ে সমস্যার সমাধান এখনো সীমিত।
প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের জীবনমান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসীদের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব রেমিট্যান্স প্রবাহেও পড়তে পারে।
সচেতন মহলের মতে, প্রবাসীদের এই সংকট কাটাতে দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিয়োগকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রবাসীদের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটির ভেতরে পারস্পরিক সহায়তার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
প্রবাস জীবনে প্রত্যাশা আর বাস্তবতার এই ব্যবধান কমাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি প্রবাসীদের সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতাই হতে পারে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি।














































