
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত পাল্টা (রেসিপ্রোকাল) শুল্কসংক্রান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু তৈরি পোশাক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় সকাল ১১টা (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা) এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক চুক্তিটি ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সই হয়।
শুরুতে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা থাকলেও জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তারা সশরীরে উপস্থিত হননি। তবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এদিকে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে উপস্থিত ছিলেন। দলে ছিলেন দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।
চুক্তি স্বাক্ষর শেষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, পাল্টা শুল্ক এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি জানান, ওষুধ, মাছ, পেপারবোর্ডসহ আরও কিছু বাংলাদেশি পণ্যও শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই চুক্তির আওতায় প্রায় দুই হাজার ৫০০টি বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত অথবা কম শুল্কে প্রবেশাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে।
চুক্তি সইয়ের পর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন মন্তব্য করেন, এই চুক্তি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং উভয় দেশের বাজারে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, আগে ৩৭ শতাংশ নির্ধারিত পাল্টা শুল্ক গত বছরের আগস্টে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। নতুন চুক্তির মাধ্যমে তা আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হলো। একই সঙ্গে মার্কিন উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বলেন, পাল্টা শুল্ক ২০ থেকে ১৯ শতাংশে নামায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন। নির্দিষ্ট তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেশের পোশাক খাতে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণাও আলোচনায় রয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভারতের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে। বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য নিজেদের বাজারে বাণিজ্য বাধা কমাবে।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। সে সময় বাংলাদেশের জন্য শুল্কহার নির্ধারণ করা হয় ৩৭ শতাংশ। পরবর্তী দফায় আলোচনা শুরুর সুযোগ রেখে হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক আরও কমানো এবং মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আগামী এক থেকে দেড় বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়, যাতে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায়।
এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা ও তুলাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করেছে।
চুক্তির আওতায় শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য, প্রযুক্তি, উৎসবিধি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন শর্তও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সোমবার উপদেষ্টা পরিষদে চুক্তিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উভয় দেশ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করে এটি কার্যকর করবে।









































