
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবে গভীর সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান। ইরান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে ফ্লাইট চলাচল অনিয়মিত হয়ে পড়ায় একদিকে যেমন নতুন কর্মী যাওয়া প্রায় বন্ধের পথে, অন্যদিকে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। গত বছরের তুলনায় চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর একই সময়ে ৪৬,৭৪৪ জন কর্মী বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র নিলেও এ বছরের ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত নিয়েছেন মাত্র ২১,১২২ জন। অথচ ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মীর ৬৭ শতাংশই গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। একক বাজার নির্ভরতার কারণে এখন যুদ্ধের প্রভাবে পুরো অভিবাসন খাতই ঝুঁকির মুখে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইরান, ইরাক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১৪টি দেশের আকাশসীমা কার্যত বন্ধ বা সীমিত। ওমান ও সৌদি আরব থেকে ছুটিতে আসা হাজারো কর্মী এখন ফিরতে পারছেন না। কোম্পানি থেকে যোগদানের চাপ থাকলেও আকাশপথ বন্ধ থাকায় তারা দিশেহারা। অনেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও ফ্লাইট বাতিলের কারণে এখন ঋণের জালে আটকে পড়ার শঙ্কায় আছেন।
চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে দুজন এবং বাহরাইন ও আরব আমিরাতে একজন করে প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার ইতিমধ্যে যুদ্ধকবলিত এলাকায় থাকা প্রবাসীদের জন্য হটলাইন চালু করেছে এবং নিহতদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপ বা জাপানের মতো দক্ষ শ্রমবাজার ধরতে না পারা এবং কেবল মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা এই সংকটের মূল কারণ। প্রায় দুই বছর ধরে মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ওকাপ-এর চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মীর নিরাপত্তা ও চাকরি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এই দুর্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট নেমে আসবে।”
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দূতাবাসগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কাতার, কুয়েত ও আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে। তবে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে জাপান ও ইউরোপের মতো নতুন শ্রমবাজার দখল করা।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী সতর্ক করে বলেছেন, নিয়মিত পথ বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ লিবিয়া বা রাশিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার মরণপণ ঝুঁকি নিতে পারে। একটি অসাধু চক্র রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অভিবাসীদের ফাঁদে ফেলছে। এই সময়ে প্রলোভনে পা না দিতে তিনি দেশবাসীকে অনুরোধ করেছেন।




































