
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই সিনেমা থামাতে ইচ্ছে করে না। যখন বাস্তবের চেয়ে এই কল্পনার গল্প বেশি টানতে থাকে
রাত গভীর। ঘরের বাতি নিভে গেছে অনেকক্ষণ আগে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া চাঁদের আলো বিছানার এক কোণে পড়ে আছে। আপনি শুয়ে আছেন—কিন্তু ঘুমোচ্ছেন না। আপনার চোখ খোলা, অথচ আপনি এখানে নেই। আপনি এখন অন্য কোথাও—হয়তো কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে, হয়তো প্রেমের গল্পে, হয়তো এমন এক জীবনে যেখানে আপনি নায়ক। এই দৃশ্যটা চেনা লাগছে?
এই চেনা অনুভূতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মানসিক অভিজ্ঞতা—ম্যালাডাপটিভ ডে ড্রিমিং। এমন এক অবস্থা, যেখানে কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়, আর মানুষ নিজের তৈরি গল্পের ভেতরেই বাস করতে শুরু করে।
কল্পনার সিনেমা, যেখানে আপনি পরিচালক
ধরা যাক, আপনার মাথার ভেতর একটা বিশাল সিনেমা হল আছে। এখানে কোনো টিকিট লাগে না, কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। আপনি নিজেই গল্প লিখছেন, চরিত্র বানাচ্ছেন, সংলাপ তৈরি করছেন।
আপনি চাইলে একজন বিখ্যাত লেখক, একজন দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা, কিংবা এমন একজন মানুষ হতে পারেন—যার জীবন বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত।
এই কল্পনার জগতে সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে। আপনি ঠিক করেন কে কী বলবে, কীভাবে ঘটনা মোড় নেবে, কোথায় ক্লাইম্যাক্স হবে। বাস্তব জীবনে যেসব কথা বলা যায় না, যেসব স্বপ্ন পূরণ হয় না—সবকিছু এখানে সম্ভব।
শুরুতে এটা খুব নিরীহ লাগে। বরং আনন্দের। একটা দীর্ঘ বাসযাত্রা, একা দুপুর, কিংবা নিরিবিলি রাত—এই সময়গুলোতে কল্পনার ভেতর ডুবে থাকা যেন এক ধরনের গোপন সুখ।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই সিনেমা থামাতে ইচ্ছে করে না। যখন বাস্তবের চেয়ে এই কল্পনার গল্প বেশি টানতে থাকে।

সময় বয়ে যায়, আপনি টেরই পান না
একটু ভেবে দেখুন—আপনি হয়তো পড়তে বসেছেন। বই খুলেছেন, কলম হাতে নিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এলো।
সেই চিন্তা ধীরে ধীরে গল্প হয়ে গেল। গল্প থেকে দৃশ্য, দৃশ্য থেকে সংলাপ। আপনি হাঁটছেন, হয়তো অজান্তেই হাত নাড়ছেন, মুখে কিছু বলছেন—আর আপনার মাথার ভেতর চলছে একটানা সিনেমা।
চোখ খুলে দেখলেন—এক ঘণ্টা কেটে গেছে। কিংবা দুই ঘণ্টা।
এই সময় হারিয়ে ফেলা—ম্যালাডাপটিভ ডে ড্রিমিংয়ের সবচেয়ে বড় লক্ষণ। এখানে সময় নিঃশব্দে গলে যায়, আর আপনি টেরই পান না কখন বাস্তব থেকে সরে গেছেন।
অনেকেই বলেন, তারা ইচ্ছে করলেও এই কল্পনা থামাতে পারেন না। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি বারবার তাদের টেনে নিয়ে যায় সেই জগতে। পড়াশোনা, কাজ, এমনকি জরুরি দায়িত্বও তখন পিছিয়ে পড়ে।
কেন এই কল্পনার আশ্রয়?
সবাই দিবাস্বপ্ন দেখে—এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু কিছু মানুষের জন্য এই স্বপ্ন দেখা হয়ে ওঠে আশ্রয়, এমন এক জায়গা যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করেন।
বাস্তব জীবনের চাপ, একাকীত্ব, অপূর্ণতা—এইসব অনুভূতি মানুষকে ধীরে ধীরে কল্পনার দিকে ঠেলে দেয়।
কেউ হয়তো একা, কারও সঙ্গে নিজের কথা বলতে পারে না, কেউ হয়তো জীবনে বারবার ব্যর্থতার মুখ দেখেছে, কারও শৈশব কেটেছে মানসিক চাপ বা ট্রমার মধ্যে, কেউ হয়তো এমন কিছু চায়, যা বাস্তবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এইসব কারণেই মানুষ নিজের ভেতর একটা বিকল্প জগৎ তৈরি করে নেয়। সেখানে সে শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য, ভালোবাসার মানুষ।
কল্পনার সেই জগতে কেউ তাকে বিচার করে না। সেখানে হারানোর ভয় নেই, প্রত্যাখ্যানের কষ্ট নেই। এই কারণেই সেই জগৎ এত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বাস্তব বনাম কল্পনা: সূক্ষ্ম এক টানাপোড়েন
ম্যালাডাপটিভ ডে ড্রিমিং পুরোপুরি খারাপ —এটা বললে ভুল হবে। কারণ এই কল্পনাশক্তিই অনেক সময় সৃজনশীলতার উৎস। অনেক লেখক, শিল্পী, নির্মাতা—তাদের কাজের বীজ খুঁজে পান এই দিবাস্বপ্নের ভেতরেই। চরিত্র, দৃশ্য, আবেগ—সবকিছু যেন এই কল্পনার ভাঁড়ার থেকেই আসে।
কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন কল্পনা বাস্তবকে ছাপিয়ে যায়। পড়াশোনায় মন বসে না, কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়, পরিবার বা বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, একা হলেই আবার সেই কল্পনার জগতে ফিরে যাওয়ার তীব্র টান তৈরি হয়।
এটা যেন এক অদৃশ্য আসক্তি—যার কোনো বাহ্যিক চিহ্ন নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষকে গ্রাস করে।অনেকেই লজ্জা বা ভয় থেকে এটা কাউকে বলতে পারেন না। তারা ভাবেন, ‘এটা কি স্বাভাবিক?’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই সময় চলে যায়।

ফিরে আসার পথ: নিজের গল্পে ফেরার চেষ্টা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটা কোনো ‘পাগলামি’ না। বরং এটা অনেক সময় আপনার মনের একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আপনার মন হয়তো আপনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কঠিন বাস্তবতা থেকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে।কিন্তু সেই আশ্রয় যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তখনই সমস্যা।
ফিরে আসার পথ আছে—তবে সেটা ধীরে ধীরে। প্রথমে নিজের অভ্যাসটা চিনে নিতে হবে। কখন আপনি বেশি দিবাস্বপ্নে ডুবে যান? কী আপনাকে ট্রিগার করে? গান? একা থাকা? নির্দিষ্ট কোনো স্মৃতি?
তারপর ছোট ছোট পরিবর্তন আনতে হবে—
সময় বেঁধে নেওয়া—’এই সময়টা আমি বাস্তবে থাকব’
দৈনন্দিন কাজগুলোকে ছোট ভাগে ভাগ করে ফেলা
শরীরকে সচল রাখা—হাঁটা, ব্যায়াম, মেডিটেশন
নতুন হবি তৈরি করা, যাতে মন বাস্তবে ব্যস্ত থাকে
সবচেয়ে বড় কথা—নিজেকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ এটা কোনো ইচ্ছাকৃত অলসতা নয়, এটা মনের একটি জটিল অভ্যাস। প্রয়োজনে মনোবিদ বা থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। প্রাণখুলে কথা বলা অনেক সময় সবচেয়ে বড় স্বস্তি দেয়।
নিজ মনে ভাবুন, আপনি আবার সেই ঘরে ফিরে এসেছেন। জানালার বাইরে রাত এখনো গভীর, চাঁদের আলো এখনো একইভাবে বিছানায় পড়ে আছে।
আপনার মাথার ভেতরের সেই সিনেমা হল এখনো আছে। থাকবে।কিন্তু এবার আপনি জানেন—কখন সেই দরজা খুলবেন, আর কখন বন্ধ রাখবেন।কারণ, বাস্তব জীবনও একটা গল্প।হয়তো একটু এলোমেলো, একটু অসম্পূর্ণ— তবুও সেটাই আপনার নিজের গল্প।আর এই গল্পের পরিচালকও আপনি—কল্পনায় নয়, বাস্তবের মঞ্চেই।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প










































