শুক্রবার । মে ১, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১ মে ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরান যুদ্ধ বদলে যাচ্ছে সমুদ্রপথ, কেন্দ্রবিন্দুতে আফ্রিকা


bab al mandeb

লোহিত সাগরের তীরে সৌদি আরবের জেদ্দা বন্দর এখন এই বিকল্প ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের প্রচলিত নৌপথে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজগুলো এখন ক্রমেই আফ্রিকা ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল করছে, ফলে এই মহাদেশ নতুন করে বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে।

গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে সরাসরি সমুদ্রপথে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে জাহাজে করে পণ্য এনে কাছাকাছি বন্দরে নামিয়ে সেখান থেকে ট্রাকযোগে গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে।

লোহিত সাগরের তীরে সৌদি আরবের জেদ্দা বন্দর এখন এই বিকল্প ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর জাহাজ সুয়েজ খাল পেরিয়ে এখানে এসে ভিড়ছে। এরপর সড়কপথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য পাঠানো হচ্ছে। তবে হঠাৎ চাপ বেড়ে যাওয়ায় বন্দরে জট তৈরি হয়েছে এবং পণ্য খালাসে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে।

শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, জেদ্দায় এই পরিমাণ চাপ সামাল দেওয়ার মতো অবকাঠামো আগে থেকে তৈরি ছিল না, তাই সময় ও খরচ—দুটিই বাড়ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় জাহাজ মালিকরা বিকল্প বন্দর ব্যবহারের পরিকল্পনাও করছেন। হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমানের সোহর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোরফাক্কান ও ফুজাইরা বন্দরের ব্যবহার বাড়ছে। একইভাবে জর্ডানের আকাবা বন্দর হয়ে ইরাকে এবং তুরস্কের করিডোর ব্যবহার করে উত্তর ইরাকে পণ্য সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোহিত সাগরে ঝুঁকি বাড়ার মূল সূত্রপাত ২০২৩ সালের নভেম্বরে, যখন ইয়েমেন উপকূল থেকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এরপর থেকেই অনেক শিপিং কোম্পানি নিরাপত্তার কারণে সুয়েজ খাল এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

ফলে এখন এশিয়া থেকে ইউরোপগামী জাহাজগুলো আফ্রিকার পূর্ব উপকূল ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের কারণে লোহিত সাগর দিয়ে যে পরিমাণ বাণিজ্য হতো, তার বড় অংশ এখন আফ্রিকা ঘুরে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেপ অব গুড হোপ হয়ে জাহাজ চলাচল কয়েক গুণ বেড়েছে, বিপরীতে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

নৌপথ দীর্ঘ হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে গড়ে প্রায় দুই সপ্তাহ বেশি সময় লাগছে। পাশাপাশি জ্বালানি খরচ ও জাহাজ পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিবর্তনের ফলে আফ্রিকার কিছু বন্দর লাভবান হচ্ছে। বিশেষ করে মরক্কোর তানজান মেদ বন্দরে পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যদিকে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে মিসর, কারণ সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় তাদের রাজস্ব ব্যাপকভাবে কমেছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথও বদলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই নতুন রুটই ভবিষ্যতে স্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল