শনিবার । মে ৯, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৯ মে ২০২৬, ২:২৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরানের ‘মস্কিটো ফ্লিট’: হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় হুমকি


Hormuz Iran

ইরানের এই ছোট আক্রমণাত্মক নৌযানগুলোর বহরকে বলা হয় ‘মস্কিটো ফ্লিট’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের প্রচলিত যুদ্ধজাহাজভিত্তিক নৌবাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির প্রকৃত সামুদ্রিক শক্তি কখনোই বড় যুদ্ধজাহাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করার মূল শক্তি হচ্ছে ড্রোন, সামুদ্রিক মাইন এবং ছোট আকারের দ্রুতগতির হামলাকারী নৌযানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বিশেষ কৌশল।

সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইরানের এই ছোট আক্রমণাত্মক নৌযানগুলোর বহরকে বলা হয় ‘মস্কিটো ফ্লিট’ বা মশা নৌবহর। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত এসব ছোট নৌযান ক্ষেপণাস্ত্র, ভারী অস্ত্র ও অন্যান্য হামলাসামগ্রী বহনে সক্ষম। বিশাল সমুদ্র এলাকাজুড়ে এসব হুমকি মোকাবিলা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত পানিতে গেরিলা যুদ্ধের মতো একটি কৌশল। ভৌগোলিকভাবেও ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালির বিকল্প কোনো সমুদ্রপথ নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়েই এই সংকীর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়।

লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) সমুদ্রশক্তি বিষয়ক গবেষক সিধার্থ কৌশল বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে যে পরিমাণ যুদ্ধজাহাজ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দরকার, তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনীকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পর থেকেই আইআরজিসি অসম যুদ্ধকৌশলনির্ভর নৌ সক্ষমতা গড়ে তোলে। এরপর থেকে প্রচলিত ইরানি নৌবাহিনী অনেকটাই আনুষ্ঠানিক বাহিনীতে পরিণত হলেও আইআরজিসির নৌবাহিনী কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এসব ছোট নৌযান পানির খুব কাছাকাছি অবস্থানে চলাচল করায় রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে সেগুলো শনাক্ত করতে হেলিকপ্টার ও ড্রোনের মতো অতিরিক্ত নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।

এছাড়া আইআরজিসি সাধারণ মাছ ধরার নৌকা এবং বেসামরিক জাহাজও গোপন অভিযান, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাইন স্থাপনের কাজে ব্যবহার করে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ইরানের এই পুরো কৌশল সরাসরি বড় নৌযুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য নয়, বরং প্রতিপক্ষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে তৈরি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন নৌযান তৈরি করে যেগুলো কম খরচে উৎপাদনযোগ্য, সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিচালনা করা সম্ভব। এতে তুলনামূলক কম ব্যয়ে তারা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে সক্ষম হয়।

ইরানের কিছু হুমকি—যেমন সামুদ্রিক মাইন বা ছোট সাবমেরিন—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য হলেও এগুলো শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রতল পর্যবেক্ষণে চালকবিহীন ডুবোযান ব্যবহার করলেও নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে পাহাড়ি ও পাথুরে এলাকায় মোতায়েন করা অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও বড় উদ্বেগের কারণ। এসব মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারে, ফলে সেগুলো ধ্বংস করা কঠিন।

সম্প্রতি জাহাজে হামলার ঘটনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যবহার বেশি দেখা গেলেও সামুদ্রিক মাইন ও দ্রুতগতির হামলাকারী নৌযান এখনো সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে অন্তত ২৬টি জাহাজ ইরানের হামলার শিকার হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশলগত লক্ষ্য ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ নয়; বরং এমন পর্যায়ের ঝুঁকি তৈরি করা, যাতে জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলো ওই পথে চলাচলকে অনিরাপদ মনে করে।

সম্প্রতি ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা চালু করেছে এবং নিরাপদ যাতায়াতের জন্য টোল আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ সতর্ক করে বলেছে, ইরানকে টোল দিলে সংশ্লিষ্ট শিপিং কোম্পানিগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল