
একজন প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রধান গল্পকার। কিন্তু স্টারমারের কোনো গল্পই নেই
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে একের পর এক নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট নতুন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে—ব্রিটেন কি ধীরে ধীরে শাসনের অযোগ্য দেশে পরিণত হচ্ছে?
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক জীবনীকার অ্যান্থনি সেলডন, যিনি বিগত আটজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জীবনী লিখেছেন, তিনি মনে করছেন দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন গুরুতর চাপে রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে যখন তিনি এই কাজ শুরু করেন, তখন একজন প্রধানমন্ত্রী সাধারণত বহু বছর ক্ষমতায় থাকতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে, একটি জীবনী শেষ করতে না করতেই নতুন প্রধানমন্ত্রী আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় জয়ের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে ব্রিটেনে আবার স্থিতিশীলতা ফিরবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে স্টারমার এখন নিজ দলের ভেতর থেকেই চাপে পড়েছেন। স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের খারাপ ফলের পর দলীয় নেতারা তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও আলোচনা চলছে।
যদি এমনটি হয়, তাহলে গত সাত বছরে ব্রিটেন পাবে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী।
সেলডন বলেন, ‘ব্রিটেন মোটেও অশাসনযোগ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে সেই অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।’ তিনি মনে করছেন, সাম্প্রতিক নেতাদের ব্যর্থতা ব্রিটেনের বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বোরিস জনসনকে তিনি ‘বড় স্বপ্নের নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, তার সরকারের বাস্তব সাফল্য ছিল সীমিত। অন্যদিকে লিজ ট্রাসের কর কমানোর পরিকল্পনা অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে এবং মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তাকে পদত্যাগ করতে হয়—যা তাকে ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী বানায়।
রিশি সুনাক দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ ইতোমধ্যেই কনজারভেটিভদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল বলে মনে করেন সেলডন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সম্পর্কে তার মন্তব্য আরও কঠোর। তিনি বলেন, স্টারমার ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও দায়িত্বশীল হলেও বড় সংকট মোকাবিলার মতো রাজনৈতিক শক্তি বা দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতে পারেননি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেন অ্যানসেলও একই মত দেন। তার ভাষায়, স্টারমার যেন এমন এক ডাক্তার, যিনি রোগীর অবস্থা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, কিন্তু কার্যকর চিকিৎসা দিতে পারেন না।
স্টারমার নির্বাচনের সময় কর না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় সরকার এখন আর্থিকভাবে চাপে রয়েছে। ফলে সরকারকে ছোট ছোট খাত থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই জনঅসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—তিনি জনগণকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেননি, তিনি আসলে কী পরিবর্তন আনতে চান।
সেলডনের ভাষায়, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রধান গল্পকার। কিন্তু স্টারমারের কোনো গল্পই নেই।’
তবে স্টারমারের সমর্থকরা বলছেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমেছে এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কও কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, জনগণ সেই উন্নতির অনুভূতি পাচ্ছে না। আর সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে ও গ্রিন পার্টির মতো দলগুলো।
এদিকে লেবার পার্টির ভেতরে এখন আলোচনায় উঠে আসছে অ্যান্ডি বার্নহামের নাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র বার্নহামকে অনেকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন।
বার্নহাম ব্যবসাবান্ধব সমাজতন্ত্র ও জনসেবাকে আবার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পক্ষে। তার নেতৃত্বে ম্যানচেস্টার বর্তমানে ব্রিটেনের সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নশীল শহরগুলোর একটি।
তবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামতে হলে তাকে আগে সংসদ সদস্য হতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বার্নহাম ব্যর্থ হন এবং ডানপন্থি শক্তি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রিটেনের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
আর তখন হয়তো সত্যিই প্রশ্ন উঠবে—ব্রিটেন কি আর কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়া সম্ভব?
সিএনএন
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প









































