
শতবর্ষেও অম্লান জাদুকরী মেরিলিন মনরো
ঝকঝকে স্বর্ণালি চুল, টকটকে লাল ঠোঁটের এক চিলতে অমলিন হাসি আর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকা এক জোড়া রহস্যময় চোখ—বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আইকন তো অনেক এসেছেন, তবে মেরিলিন মনরো শুধু একজনই। আজ ১ জুন, রুপালি পর্দার এই চিরন্তন রূপকথার জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলো। এক শতাব্দী পেরিয়েও তাঁর গ্ল্যামার, অবিনশ্বর জনপ্রিয়তা আর জীবন-জিজ্ঞাসা যেন সময়কে অনায়াসে হার মানায়। জন্মের এই শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আজ পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নানামুখী স্মারক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। কিন্তু এই জাঁকজমকের মাঝেও একটি চিরন্তন প্রশ্ন আজ নতুন করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—মেরিলিন মনরো আসলে কে ছিলেন? তিনি কি কেবলই এক সৌন্দর্যের প্রতীক, নাকি সেই জাদুকরী হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক জটিল, সংগ্রামী এবং অসাধারণ বুদ্ধিমতী নারীর না-বলা আখ্যান?
এক অসমাপ্ত স্বপ্নের শুরু
কাব্যিক এই কাহিনীর শুরু ১৯২৬ সালের ১ জুন, লস অ্যাঞ্জেলেসের এক ধূসর অধ্যায়ে, যেখানে জন্ম নিয়েছিল নরমা জিন মর্টেনসন নামের এক একাকী শিশু। শৈশব ছিল অনাথ আশ্রম আর পালক পরিবারের অনিশ্চয়তায় ঘেরা, যেখানে ছিল না কোনো নিরাপদ আশ্রয় বা আর্থিক নিশ্চয়তা। কিন্তু বুকভরা একাকিত্ব নিয়ে বড় হওয়া সেই মেয়েটিই একদিন নিজের নাম বদলে হয়ে ওঠেন ‘মেরিলিন মনরো’—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মোহনী মুখগুলোর একটি। মডেলিংয়ের হাত ধরে রূপালী জগতে পা রাখা এই অভিনেত্রীর পর্দার উপস্থিতি যেন ছিল মুগ্ধতার এক জাদুকরী আলো! ‘জেন্টলমেন প্রিফার ব্লন্ডস’, ‘হাউ টু ম্যারি অ্যা মিলিয়নেয়ার’ কিংবা ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো তাঁকে পৌঁছে দেয় খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে। বিশেষ করে ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ সিনেমায় সাবওয়ে ভেন্টের বাতাসে উড়ে যাওয়া সেই বিখ্যাত সাদা পোশাক পরা মনরোর দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক চিরন্তন মুহূর্ত, যা দেখলে আজও মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে।
সৌন্দর্যের আড়ালে এক সাহসী মনন ও চিন্তার জগত
হলিউড যখন মেরিলিনকে কেবলই এক অবয়ব বা ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে খাঁচাবন্দি করতে চেয়েছে, তিনি তখন নিজের ভেতরের প্রজ্ঞা দিয়ে সেই ছক ভাঙার সাহস দেখিয়েছেন। বই, সাহিত্য, শিল্প আর দর্শনের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। পঞ্চাশের দশকের রক্ষণশীল আমেরিকার বুকে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, থেরাপি এবং নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছিলেন। এমন এক সময়ে যখন বড় বড় স্টুডিও-প্রধানেরা অভিনেত্রীদের পুরো জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন, তখন মনরো নিজের মতামত প্রকাশে দ্বিধা করেননি, উল্টো নিজের ইমেজ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। ক্যামেরার কোণ, আলোর ব্যবহার কিংবা নিজেকে উপস্থাপনের কৌশলে তিনি এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে, আজকের গবেষকেরা তাঁকে আধুনিক ‘তারকা-সংস্কৃতি’ ও সেলফ-ব্র্যান্ডিংয়ের আদি অগ্রদূত বলে গণ্য করেন।
এমনকি ১৯৫২ সালে যখন তাঁর অতীত জীবনের নগ্ন মডেলিংয়ের ছবি নিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংসকারী বিতর্ক তৈরি হয়, তখন স্টুডিওর নিষেধ সত্ত্বেও তিনি সত্যটি স্বীকার করেন এবং জানান যে অর্থকষ্টের কারণেই তিনি তা করেছিলেন। এই সততা ও নির্ভীক অবস্থান বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যায়।
একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস
মেরিলিনের গল্পটি শুধু গ্ল্যামারের আলোয় রাঙানো নয়, এটি এক গভীর নিঃসঙ্গতারও কবিতা। বেসবল কিংবদন্তি জো ডিম্যাজিও থেকে শুরু করে প্রখ্যাত নাট্যকার আর্থার মিলার—তাঁর প্রেম, বিয়ে আর বিচ্ছেদের গল্প বারবার সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে, কিন্তু কোনো সম্পর্কই তাঁকে স্থায়ী সুখ দিতে পারেনি। খ্যাতির তীব্র আলোর ঠিক পিঠেই ভর করেছিল এক চরম অন্ধকার ও মাদক-অ্যালকোহলের সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রাম। শুটিং সেটে দেরি করে পৌঁছানো বা অস্থির আচরণের জন্য তীব্র সমালোচনা সইতে হলেও বর্তমান বিশ্লেষকদের মতে, তার পেছনে ছিল তৎকালীন সমাজের এক ধরনের নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ এই নিঃসঙ্গ নারীটিই কোরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লান্ত ও ধুলোমাখা সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে যখন গান গেয়েছিলেন, তখন তিনি কেবল একজন দূর আকাশের তারকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন হাজারো যুদ্ধক্লান্ত চোখের জন্য দূরদেশ থেকে ভেসে আসা একমুঠো ওম আর ঘরের উষ্ণতা।
শতবর্ষের জাদু ও অমীমাংসিত রহস্য
১৯৬২ সালের আগস্টে, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, মাত্র ১৭ বছরের এক সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারের মাথায় থেমে যায় মেরিলিন মনরোর জীবনঘড়ি। সরকারি নথিতে একে ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রাজনিত মৃত্যু বলা হলেও, কেনেডি পরিবার থেকে শুরু করে পরাক্রমশালী ব্যক্তিদের জড়িয়ে আজ অবধি অসংখ্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ডালপালা মেলেছে, যা তাঁর মৃত্যুকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। মৃত্যুর ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে লস অ্যাঞ্জেলেসের একাডেমি মিউজিয়ামে বসেছে ‘মেরিলিন মনরো: হলিউড আইকন’ শীর্ষক এক বিশেষ প্রদর্শনী। সেখানে তাঁর চিঠিপত্র, চলচ্চিত্রের স্মারক আর ‘জেন্টলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস’ সিনেমার সেই বিখ্যাত গোলাপি গাউনটি দেখতে ভিড় করছেন হাজারো মানুষ, যা আজও গ্ল্যামার আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
মেরিলিন মনরো আজ ইতিহাসের এমন এক কবিতা, যার শেষ পঙক্তি বহু আগেই লেখা হয়ে গেছে, অথচ যার মোহ কাটেনি এক বিন্দুও। কীভাবে একজন নারী একই সাথে এতটা শক্তিশালী অথচ এতটা ভঙ্গুর হতে পারেন, কীভাবে কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েও ভেতরের শূন্যতা মেটানো যায় না—এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। আর সম্ভবত এখানেই তাঁর প্রকৃত জাদু। জন্মের একশ বছর পরও রুপালি পর্দার ওপারে, সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেরিলিন মনরো বেঁচে আছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের হৃদয়ে—এক চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস, এক অনন্ত বিস্ময় হয়ে।



















































