মঙ্গলবার । জুন ১৬, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ১৬ জুন ২০২৬, ১০:২১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

ভোজিনহা: পাঁচ লক্ষ স্বপ্নের প্রহরী, একাই রুখলো গোটা স্পেন


Vojinho

ভোজিনহা- কেপ ভারদের ত্রাণকর্তা

ফুটবলে কিছু রাত থাকে, যেগুলো পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিছু রাত থাকে, যেগুলো কেবল গল্প হয়ে বেঁচে থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেই রাতটিও তেমনই এক রাত। সেই রাতের নাম—ভোজিনহা।

ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের মানুষ যখন রাস্তায় নেমে উৎসব করছিল, তখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীরা একটাই কথা বলছিল—”ভোজিনহা কি সত্যিই মানুষ?”

স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে বলের দখল ছিল প্রায় ৭৪ শতাংশ। নিজেদের মধ্যে তারা ৭৩৪টি সফল পাস খেলেছে। কেপ ভার্দের পোস্ট লক্ষ্য করে নিয়েছে ২৭টি শট। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরবোর্ডে তখনও জ্বলছে সেই অবিশ্বাস্য ফল—০-০।

স্পেন গোল করতে পারেনি।

কারণ, গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক চল্লিশ বছর বয়সী মানুষ। নাম তাঁর ভোজিনহা।

কেউ বলছে, তিনি ছিলেন একটি দেয়াল। কেউ বলছে, তিনি ছিলেন ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বাতিঘর। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ মজা করে লিখেছেন, ‘যুদ্ধে জিততে হলে দায়িত্ব ভোজিনহাকে দাও, সঙ্গে আরও দশজন সৈনিক দিলেই হবে। বাকি কাজ সে নিজেই করে নেবে।’

অতিরঞ্জন?

গত রাতের ম্যাচ দেখলে হয়তো মনে হবে না।

স্পেন একের পর এক আক্রমণ সাজিয়েছে। পাসের পর পাস, মুভের পর মুভ। মনে হচ্ছিল গোলটি শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু প্রতিবারই সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ভোজিনহা। কখনো ডাইভ দিয়ে, কখনো রিফ্লেক্স সেভে, কখনো আবার অবিশ্বাস্য পজিশনিংয়ে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন নিশ্চিত গোল।

কেউ বলছে চারটি, কেউ বলছে সাতটি—সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটা বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। ম্যাচের সবচেয়ে বড় নায়ক ছিলেন তিনিই।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো এক অচেনা মুখ হঠাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কিন্তু ভোজিনহার গল্পটা শুধু ফুটবলের নয়। এটা সংগ্রামের গল্প।

শোনা যায়, অর্থাভাবে তিনি নিজের মাকে বিশ্বকাপ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে আনতে পারেননি। কোটি টাকার তারকাদের বিশ্বকাপে একজন গোলরক্ষক নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে গ্যালারিতে বসাতে পারেননি। কিন্তু সেই মানুষটিই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের দেশের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

কেপ ভার্দে—আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র। জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি। পৃথিবীর বহু শহরের জনসংখ্যাও এর চেয়ে বেশি। সেই দেশের মানুষ গত রাতে নিজেদের চোখে দেখেছে, স্বপ্ন দেখার জন্য বড় দেশ হতে হয় না।

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ড্র করাটাই তাদের কাছে জয়ের সমান।

আর সেই জয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ভোজিনহা।

অনেকেরই মনে পড়ে গেছে বিখ্যাত Shaolin Soccer চলচ্চিত্রের সেই কিংবদন্তি গোলরক্ষকের কথা। যিনি একাই পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে অসম্ভব সব শট ঠেকিয়ে দিতেন। গত রাতে বাস্তবের ফুটবল মাঠে ভোজিনহাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সিনেমার সেই চরিত্র যেন হঠাৎ বাস্তবে নেমে এসেছে।

তবে ভোজিনহার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সেভগুলো নয়।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফুটবল এখনো শুধু অর্থ, পরিকাঠামো আর তারকাদের খেলা নয়। এখানে এখনো স্বপ্নের জায়গা আছে। এখানে এখনো এক অজানা দ্বীপদেশ বিশ্বের সেরা দলগুলোর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে। এখানে এখনো একজন চল্লিশ বছর বয়সী গোলরক্ষক পুরো পৃথিবীকে বিস্মিত করতে পারেন।

বিশ্লেষকেরা এই বিশ্বকাপকে ইতোমধ্যেই “আন্ডারডগদের বিশ্বকাপ” বলতে শুরু করেছেন। যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে সেই মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়ের নায়ক নিঃসন্দেহে ভোজিনহা।

শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি হয়তো কেবল একটি পয়েন্ট জিতেছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি জিতেছেন আরও অনেক কিছু। জিতেছেন লাখো স্বপ্নবাজ মানুষের হৃদয়। জিতেছেন সেই সব ছোট দেশের বিশ্বাস, যারা এখনো মনে করে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি প্রমাণ করেছেন—

পৃথিবী যতবার বলবে “তুমি পারবে না”, ফুটবল ততবার ভোজিনহার মতো মানুষের গল্প লিখে উত্তর দেবে—

স্বপ্ন দেখা কখনো বন্ধ করো না।’’

 

বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস