মঙ্গলবার । জুন ১৬, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ১৬ জুন ২০২৬, ৬:২৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

অঘটন-ঘটন পটিয়সী সৌদি

সৌদির অঘটনের মঞ্চে আরাউহোর উদ্ধার অভিযান


২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল সৌদি আরব। চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই সৌদি যেন উরুগুয়ের বিপক্ষে আবারও লিখতে যাচ্ছিলো আরেকটি রূপকথা।

হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৭৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত আবদুলেলাহ আল আমরির গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল গ্রিন ফ্যালকনরা। আর ঠিক তখনই ফুটবল বিশ্ব হয়তো প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল নতুন এক অঘটনের গল্প শোনার জন্য।

কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে দিল না উরুগুয়ে। ৮০ মিনিটে বক্সের ভেতরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন ম্যাক্সি আরাউহো। গোলটি শুধু সমতা ফেরায়নি, উরুগুয়েকে রক্ষা করেছে সম্ভাব্য এক বিব্রতকর হার থেকেও। আবদুলেলাহ আল আমরির গোলটি ৭৯ মিনিট পর্যন্ত উরুগুয়ের ওপর ঝুলে ছিল সম্ভাব্য এক বড় বিপর্যয়ের ছায়া্র মতো। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট খোয়ানোর শঙ্কায় কাঁপছিল মার্সেলো বিয়েলসার দল। কিন্তু ঠিক যখন সৌদি সমর্থকেরা আরেকটি ঐতিহাসিক জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, তখনই হাজির হন  ম্যাক্সি আরাউহো।

স্কোরলাইন বলবে ম্যাচটি ১-১ ড্র হয়েছে। কিন্তু ম্যাচের গল্প ছিল অনেক বেশি নাটকীয়, ফলাফল হয়তো পুরো গল্পটা বলবে না।

ইদানিংকালে বিশ্বকাপ এলেই সৌদি আরবকে নিয়ে  ফুটবল পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা কাজ করার কারণ আছে বৈকি! কারণ দলটি হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার নয়, কিন্তু তারা জানে কীভাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে দৈত্যদের অস্বস্তিতে ফেলতে হয়। ২০২২ সালে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছিল গ্রিন ফ্যালকনরা। চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছিলো। কিন্তু বাঁধ সাধলেন ম্যাক্সি আরাউহো।

প্রথমার্ধে ম্যাচটি ছিল তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও ছন্দহীন। উরুগুয়ে বলের দখল বেশি রাখলেও সৌদির সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারছিলো না। বরং ৪০ মিনিটে কর্নার থেকে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় এগিয়ে যায় সৌদি আরব। আল-জুয়াইরের কর্নার থেকে হেড নামিয়ে দেওয়া বল ফার্নান্দো মুসলেরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। সুযোগসন্ধানী আল আমরি সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন।

বিরতির পর যেন একেবারে অন্য রূপে মাঠে নামে উরুগুয়ে, এক ক্ষুধার্ত উরুগুয়ে। একের পর এক আক্রমণে সৌদির রক্ষণভাগকে চূর্ণবিচূর্ণ করার চেষ্টা চালায় মার্সেলো বিয়েলসার দল। ৫১ মিনিটে নিকোলাস ভিনাসের হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। ৬১ মিনিটে ম্যানুয়েল উগার্তের দূরপাল্লার শট পোস্টে আঘাত হানে, যদিও তার আগে গোলরক্ষক মোহাম্মদ আল-ওয়াইসের আঙুলের স্পর্শ ছিল বলটিতে। ৬৮ মিনিটে ভালভার্দের ফ্রি-কিকও দক্ষতার সঙ্গে ঠেকিয়ে দেন সৌদি গোলরক্ষক। দ্বিতীয়ার্ধের এক পর্যায়ে ম্যাচটি প্রায় একমুখী হয়ে ওঠে। সৌদি বক্সের দিকে একের পর এক আক্রমণ, ক্রস, কর্নার আর শটের বন্যা বইয়ে দেয় উরুগুয়ে।

৮৫ মিনিট পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে তাদের গোলের প্রচেষ্টার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। সৌদি গোলপোস্টের সামনে চলছিল অবিরাম ফুটবল-বর্ষণ।তবু গ্রিন ফ্যালকনরা টিকে ছিল। প্রতিটি ব্লক, প্রতিটি ক্লিয়ারেন্স, প্রতিটি সেভ যেন তাদের আরও একটু করে কাছে নিয়ে যাচ্ছিল আরেকটি বিশ্বকাপ রূপকথার।

কখনও ভিনাসের হেড, কখনও উগার্তের দূরপাল্লার শট পোস্টে আঘাত হানে, কখনও আবার ফেদেরিকো ভালভার্দের শক্তিশালী প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক মোহাম্মদ আল-ওয়াইস।

তবু সৌদি রক্ষণ দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ গড়ে রেখেছিল। অবশেষে ৮০ মিনিটে সেই প্রতিরোধ ভাঙে। ঢেউয়ের পর ঢেউ সামলাতে সামলাতে তারা যেন আরেকটি বিশ্বকাপ অঘটনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই দেয়ালে ফাটল ধরান আরাউহো।  ডান দিক থেকে আসা আরেকটি আক্রমণে ভিনাসের হেড আল-ওয়াইস প্রতিহত করলেও বল নিরাপদ জায়গায় সরাতে পারেননি। বক্সের মধ্যে অপেক্ষায় থাকা আরাউহো রিবাউন্ডে জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে উরুগুয়েকে সমতায় ফেরান। গোলের পর উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের উদযাপনই বলে দিচ্ছিল, এটি কেবল সমতাসূচক গোল নয়; এটি ছিল মুক্তির গোল।

এরপরও নাটক শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ে ফেদেরিকো ভালভার্দের শক্তিশালী দূরপাল্লার শট অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন আল-ওয়াইস। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে যায় উরুগুয়ে, কিন্তু সৌদি আরব আর কোনো ভুল করেনি।

ফলে ম্যাচটি শেষ হয় ১-১ সমতায়। ফলাফলের বিচারে এটি হয়তো একটি ড্র। কিন্তু বিশ্বকাপের গল্পে এটি ছিল দুই ভিন্ন অনুভূতির ম্যাচ। উরুগুয়ের কাছে এক পয়েন্ট ছিল স্বস্তির নিশ্বাস, লজ্জায় না পড়ে ‘কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। আর সৌদি আরবের কাছে এক অঘটনের স্বপ্নভঙ্গ,  জয়ের  কাছাকাছি তবু অনেক দূরে, অধরা জয়ের আক্ষেপ।

এই ম্যাচের ‘ম্যাজিক মোমেন্ট’ যদি একটি বেছে নিতে হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে আরাউহোর সমতাসূচক গোল। কারণ এই গোলই উরুগুয়ের  মুক্তির নিশ্বাস, সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হাত থেকে শেষ মুহূর্তের উদ্ধার। উরুগুয়ের এক জাতীয় লজ্জার   মুখ থেকে বেঁচে ফেরা।

তবু এই ম্যাচ আবারও মনে করিয়ে দিয়ে গেলো, এখন থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে সৌদি আরবকে কখনোই আর হালকাভাবে নেওয়া যায় না। কারণ অঘটন-ঘটন পটিয়সী এই দলটি সুযোগ পেলেই ফুটবল বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণগুলোকে ওলটপালট করে দিতে পারে।