sentbe-top

আরেকটি যুদ্ধের ভার কি বইতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র?

গত দশকে ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধঋণ জমা করার পর আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ইরাক-আফগানিস্তান থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এক শান্তির যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কিন্তু সে শান্তির যুগটি বলা যায় সংক্ষিপ্তই হবে। বিশ্বজুড়ে মাথা গজিয়ে উঠেছে নতুন কিছু নিরাপত্তা হুমকি, যার কারণে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে সামরিক হস্তক্ষেপের। মাটিতে সেনাবাহিনীর পদচারণ না হলেও আকাশে এখন টহলদার বিমান ও ড্রোনের আধিক্য বেড়েই চলছে।

090112_Mexico_1.12_resizedইরাকে নতুন করে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা এবং গণমাধ্যমে আইসিস কর্তৃক মার্কিন সাংবাদিকের শিরশ্ছেদ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে শুধু আরেকটি যুদ্ধের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন করে তুলছে না, একই সঙ্গে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে অর্থনীতি সে যুদ্ধের খরচ বহন করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে কিনা। এটা সত্য, আর্থিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আবার একটা যুদ্ধ বাঁধাতে সক্ষম। নব্বইয়ের দশকে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ইরাকে নো-ফ্লাইয়িং জোনে বিমান টহলদারিতে দেশটির খরচ হয়েছে বার্ষিক ১২ বিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের কেইন পোলকের হিসাবে, সিরিয়ায় বিরোধীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আইসিস ও আসাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হবে বার্ষিক ২০-২২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ইরাক ও আফগানিস্তানে খরচের তুলনায় আসাদ-আইসিসের বিরুদ্ধে অভিযান বেশ সাশ্রয়ী বলা যায়। ওই দুুটি দেশে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করে।

যুদ্ধের জন্য বরাদ্দ ট্রিলিয়ন ডলারের বাইরেও পেন্টাগনের নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ ২০০১ সালের পর বেড়েছে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এ বিপুল পরিমাণ অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য নেই পেন্টাগনের হাতে। ২০১১ সালে বাজেটে ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে সংস্থাটি তার বাজেটে বেশকিছু কাটছাঁটের উদ্যোগ নেয়। এছাড়া আগামী দশকজুড়ে সামরিক ব্যয় ৫৪০ বিলিয়ন ডলার কমাতে ব্যবস্থা নেয় কংগ্রেস।

কিন্তু বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়া মানে কংগ্রেস বা পেন্টাগনের ব্যয়সংকোচনের নীতিরও পাল্টা যুক্তি তৈরি হওয়া। ইরাকের সাম্প্রতিক অরাজকতার আগেও মার্কিন সেনাবাহিনী ব্যয়সংকোচন নীতি মেনে চলতে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। এছাড়া মিশেলে ফ্লোরনয়ের মতো পেন্টাগনের অনেক শীর্ষ নীতিনির্ধারক ক্রমাগত বলে আসছেন, বাজেট কমালে তাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর সক্ষমতাই কমবে।

কিন্তু ১২ বছরের যুদ্ধে আমেরিকার অর্থনীতির সক্ষমতা এরই মধ্যে অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিযান চালাতে ২ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছিল দেশটি। দেশটির সার্বিক ঋণের পরিমাণ ২০০৩ সালে ৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বর্তমানে ১৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়নে উন্নীত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে সেই যুদ্ধঋণটি। যুদ্ধের কারণে দাম বেড়েছে জ্বালানি তেলেরও। ২০০৩ সালে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ২৫ ডলার, যা ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ১৪০ ডলারে পৌঁছে। এছাড়া এখনো দেশটি ইরাক ও আফগানিস্তানে নিয়োজিত সেনাদের স্বাস্থ্যসেবা ও পঙ্গুত্বের ক্ষতিপূরণ দেয়নি, যা যুদ্ধটির অন্যতম বড় একটি খরচের খাত।

দুই ব্যর্থ যুদ্ধের পরও মনে হচ্ছে, দেশটি এখনো সামরিক অভিযানের বিপুল ব্যয়ভার থেকে শিক্ষা নেয়নি। ২০০৩ সালে প্রশ্ন করা হয়েছিল ইরাক যুদ্ধের খরচ কিভাবে জোগানো হবে, কিন্তু মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো উত্তরই দেয়া হয়নি। এমনকি যুদ্ধে যাওয়া বেশ ব্যয়বহুল হবে— এমন মতামত দেয়ায় বুশ প্রশাসনের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ লরেন্স লিন্ডসেকে বরখাস্ত করা হয়।

গত দুই যুদ্ধের চেয়ে এবারের বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক দুর্বল আর্থিক ভিত্তি নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যুদ্ধঋণ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, যথারীতি তারও কোনো ব্যাখ্যা নেই। যদি যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়েই পড়ে, তাহলে অচিরেই প্রেসিডেন্টের উচিত জনগণের সামনে এসে বলা, এ যুদ্ধ আসলে কী সমাধান বয়ে আনবে এবং কীভাবেই বা যুদ্ধের ব্যয় মেটানো হবে।

সিএনএন অবলম্বনে/ বণিকবার্তা।

sentbe-top