রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:৩৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

‘রক্ত ঝরুক তবুও সংবিধান রক্ষা করব’ – বঙ্গভবনের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতির


President

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

প্রায় দেড় বছরের এক দীর্ঘ গুমোট ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দেশে এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের বিদায় ঘটলেও, সেই সময়ে বঙ্গভবনের চার দেয়ালের ভেতরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে যে মানসিক যুদ্ধ আর প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার এক রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে তাঁর সাম্প্রতিক এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে।

বেসরকারি সংবাদমাধ্যম কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীনকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, সেই দেড় বছর তিনি আড়ালে থাকলেও তাঁকে ঘিরে চলেছিল নানামুখী চক্রান্ত।

সংবিধান রক্ষার কঠিন শপথ
সাক্ষাৎকারে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওই দেড় বছর আমি কোনো আলোচনায় নেই অথচ আমাকে নিয়ে চলে নানা চক্রান্ত। অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।” নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেন, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব—আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম।

বঙ্গভবন ঘেরাও এবং সেই বিভীষিকাময় রাত
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের রাতটির বর্ণনা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। ফ্লাইওভার দিয়ে ঠেলাগাড়ি, ভ্যান আর কাভার্ড ভ্যানে করে ছিন্নমূল লোকজন আনা হয়েছিল। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল তারা।” তিনি জানান, সেখানে ভাড়াটিয়া লোকজন ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। একপর্যায়ে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই রাতে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানিয়েছিলেন যে বিক্ষোভকারীরা তাদের লোক নয়। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ড. ইউনূসের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা ও আড়ালে রাখার চেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তিক্ততা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি অভিযোগ করেন, “প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি। উনি ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন, কিন্তু একবারও আমাকে জানাননি। কোনো চুক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাকে লিখিত বা মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়নি।”

Interview with president

বিশেষ সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি

তিনি আরও জানান, কসোভো এবং কাতারের আমিরের দেওয়া আমন্ত্রণগুলো তাঁর কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি। বরং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর অজান্তেই ফিরতি চিঠিতে লিখে দিয়েছিল যে রাষ্ট্রপতি ‘ব্যস্ত’ আছেন। মো. সাহাবুদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “মূলত অন্তর্বর্তী সরকার চায়নি কোথাও আমার নাম আসুক। তারা চায়নি জনগণ আমাকে চিনুক বা জানুক। এটি আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে।”

প্রেস উইং প্রত্যাহার ও ছবি নামিয়ে ফেলার অপমান
রাষ্ট্রপতিকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, “একদিন হঠাৎ করে এক উপদেষ্টা বিদেশে গিয়ে হাইকমিশনে আমার ছবি দেখে গালিগালাজ করেন। এরপর এক রাতের মধ্যে সারা পৃথিবীর সব হাইকমিশন থেকে আমার ছবি নামিয়ে দেওয়া হলো।” এমনকি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার অপরাধে বঙ্গভবনের পুরো প্রেস উইং—প্রেস সেক্রেটারি থেকে শুরু করে ফটোগ্রাফার পর্যন্ত সবাইকে প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে ক্রিকেট দলের জয়ে অভিনন্দন জানানোর মতো নূন্যতম সুযোগটিও তাঁর ছিল না।

বিএনপির ভূমিকা ও তিন বাহিনীর সমর্থন
এই দুঃসময়ে রাজনৈতিক সমর্থন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। বিশেষ করে তারেক রহমান খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল!” তিনি জানান, বিএনপি এবং তিন বাহিনীর প্রধানদের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার এবং একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে সেই স্থানে বসানোর চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। তিন বাহিনী প্রধানরা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আপনি পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।”

দেড় বছরের সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তির স্বস্তি নিয়ে রাষ্ট্রপতি এখন নতুন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেখানে সাংবিধানিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।