রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৬ মার্চ ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

আইআরজিসির নতুন কমান্ডার কে এই আহমদ ভাহিদি?


Ahmad vaihidi

(আইআরজিসি)-এর নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদি

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদি। এটি ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী সামরিক পদগুলোর একটি—যেখানে মৃত্যুর ঝুঁকিও সবসময় ঘনিয়ে থাকে।

ভাহিদি এমন এক সময় আইআরজিসির নেতৃত্বে এলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরান তীব্র সংকটের মুখে। এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, ইরানের বিভিন্ন শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং দেশটির অনেক শীর্ষ সামরিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।

এই পদটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইআরজিসির কুদস ফোর্সের দীর্ঘদিনের কমান্ডার কাসেম সোলায়মানী ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আইআরজিসি’র সর্বশেষ প্রধান মোহাম্মদ পাকপৌর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার শুরুতেই নিহত হন। তিনি দায়িত্ব পেয়েছিলেন এর আগে ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়া তার পূর্বসূরি হোসেন সালামির জায়গায়, যিনি ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে নিহত হন।

আইআরজিসির শীর্ষ নেতৃত্বে এই ধারাবাহিক পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের সামরিক কাঠামোর এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এখন ভাহিদির সামনে এমন এক দায়িত্ব এসেছে, যা এমনকি ইরানের অন্যতম কিংবদন্তি সামরিক নেতা সোলেইমানিকেও নিতে হয়নি—একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ইরানের সামরিক শক্তির নেতৃত্ব দেওয়া।

আহমদ ভাহিদি কে?
ভাহিদির আইআরজিসি প্রধান হিসেবে নিয়োগ খুব একটা বিস্ময়কর নয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাকে আইআরজিসির উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এর আগে তিনি ইরানের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই গঠিত আইআরজিসির প্রথম দিকের সদস্যদের একজন ছিলেন ভাহিদি। ১৯৮০-এর দশকে তিনি গোয়েন্দা ও সামরিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে দ্রুত উত্থান ঘটান।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি আইআরজিসির বিশেষ বাহিনী কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। পরে ১৯৯৮ সালে এই বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন কাসেম সোলেইমানি, যিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ভাহিদি প্রকাশ্যে ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ ও লক্ষ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ডিসেম্বরে আইআরজিসির উপপ্রধান হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “ইসলামী বিপ্লব রক্ষা করা পৃথিবীর অন্যতম বড় গুণ, আর ইসলামী ব্যবস্থার বিরোধিতা করা সবচেয়ে বড় অন্যায়।”

২০২৫ সালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামী বিপ্লবকে “একটি আলোর বিস্ফোরণ” হিসেবে বর্ণনা করেন, যা অঞ্চলের এবং বিশ্বের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।

তবে প্রয়োজন হলে তিনি বাস্তববাদী সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের গোপন যোগাযোগেও তিনি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগ ছিল কুখ্যাত ইরান-কন্ট্রা এফেয়ারের অংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল।

মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব
তার দুই পূর্বসূরির মতো শুধু সামরিক কর্মকর্তা নন ভাহিদি; তিনি রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের আমলে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। পরে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৪ সালে সেই পদ ছাড়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক ও সামরিক—দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আইআরজিসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতা হতে পারেন।

বিতর্ক ও অভিযোগ
তবে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় তার জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিস’ জারি করেছিল। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হন।

ইরান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে “ভিত্তিহীন” বলে দাবি করেছে।

এছাড়া ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

আইআরজিসিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ভাহিদির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রায় সব স্তরেই তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আঘারচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কিছু সামরিক ইউনিট এখন তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং সাধারণ নির্দেশনার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে আইআরজিসির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী জাফারি সংগঠনটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলেন, যাতে রাজধানী তেহরানের পতন হলেও সংগঠনটি টিকে থাকতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ভাহিদি অভিজ্ঞ কমান্ডার ও আইআরজিসির প্রবীণ সদস্যদের নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক সমষ্টিগত নেতৃত্বের মাধ্যমে বাহিনী পরিচালনা করতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নেতৃত্ব এমন একজনকে বেছে নিতে চেয়েছে যিনি একই সঙ্গে বিশ্বস্ত, দক্ষ এবং যুদ্ধে বাহিনীর মনোবল ধরে রাখতে সক্ষম।

কারণ, অনেকের মতে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা অনেকটাই নির্ভর করছে আইআরজিসির ওপর—এবং বর্তমান যুদ্ধই সেই পরীক্ষার সবচেয়ে বড় মুহূর্ত।

আল জাজিরা অবলম্বনে