রবিবার । মার্চ ৮, ২০২৬
মাহবুব কিংশুক আন্তর্জাতিক ৫ মার্চ ২০২৬, ৮:৪২ অপরাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্র যখন কুর্দিদের ইরানে আক্রমণে উৎসাহ দিচ্ছে, ইতিহাস দিচ্ছে অন্ধকার সতর্কবার্তা


Kurdi Iran

এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট খোলার চেষ্টা করছে

‘গোপন অভিযানকে কখনোই ধর্মপ্রচারমূলক কাজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়’—১৯৭৫ সালে ইরাকের কুর্দিদের হঠাৎ করে তাদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পর এমন মন্তব্য করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার।

অর্ধশতাব্দী পরে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নীতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কুর্দি মিলিশিয়াদের সম্ভাব্য স্থলবাহিনী হিসেবে উৎসাহিত করছে—কারণ তারা জানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বাস্তবায়নে স্থলযুদ্ধ প্রয়োজন—তখন ইতিহাস একটি কঠোর সতর্কবার্তা সামনে এনে দিচ্ছে।

১৯৯১ সালে ইরাকের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে কয়েক সপ্তাহ আগের সিরিয়ার সমতলভূমি—ওয়াশিংটনের ইতিহাস দেখায়, কুর্দি যোদ্ধাদের অনেক সময়ই ব্যবহারযোগ্য প্রক্সি বাহিনী হিসেবে দেখা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়, ইরানে কুর্দি বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার বর্তমান পরিকল্পনা বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট খোলার চেষ্টা করছে।

কিছু মার্কিন গণমাধ্যম দাবি করেছে, হাজার হাজার ইরানি কুর্দি ইরাকে থেকে সীমান্ত পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম ইরানে স্থল অভিযানে যোগ দিয়েছে। তবে এ তথ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে গোপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এসব বাহিনীকে হালকা অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি ইরাকের কুর্দি নেতা মাসউদ বিারজানি ও বাফেল তালাবানি এবং ইরানি কুর্দি নেতা মুস্তাফা হিজরির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। যদিও হোয়াইট হাউস এবং এরবিলের কুর্দি কর্মকর্তারা এসব প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করেছেন, তবু আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের সরকারও যেকোনো ধরনের সামরিক সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। অঞ্চলটির প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানি বলেছেন, এই অঞ্চল ‘কোনো সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনার অংশ হতে পারে না, যা আমাদের নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কুর্দিস্তান অঞ্চলের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সাংবিধানিক অর্জন রক্ষা করা সম্ভব কেবল কুর্দিস্তানের সব রাজনৈতিক শক্তি ও জনগোষ্ঠীর ঐক্য ও যৌথ দায়িত্ববোধের মাধ্যমে।’

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন শীর্ষস্থানীয় আঞ্চলিক বিশ্লেষক বলেন, বর্তমান কৌশলের লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; বরং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উসকে দিয়ে ‘ইরানকে ভেঙে ফেলা’। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে এমন একটি সশস্ত্র কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যেমনটি তারা সিরিয়ায় তৈরি করেছিল।’

এই অস্থির পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তুরস্কের প্রতিক্রিয়া। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) গত গ্রীষ্মে নিরস্ত্রীকরণের দিকে অগ্রসর হয়, যা তুরস্কের সঙ্গে চার দশকের সংঘাতের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটায়—এই সংঘাতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইরানি কুর্দিদের কোনো সশস্ত্র অগ্রগতি আঙ্কারাকে আবারও ক্ষুব্ধ করতে পারে।

বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস ও অনিচ্ছাকৃত সাফল্য
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের অগ্রভাগে থাকার অভিজ্ঞতা কুর্দিদের জন্য অনেক সময় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইরাকের কুর্দি বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে বাগদাদ সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ইরান ও ইরাকের মধ্যে সীমান্ত সমঝোতা হয়ে গেলে ইরানের শাহ রাতারাতি কুর্দিদের সহায়তা বন্ধ করে দেন—ওয়াশিংটনের সম্মতিতেই। চার বছর পর তিনি নিজেই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হন।

একই ঘটনা আবার ঘটে ১৯৯১ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকিদের—বিশেষ করে কুর্দি ও শিয়া জনগোষ্ঠীকে—সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর মার্কিন বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকে। পরে সরকারি বাহিনী হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহার করে নির্বিচারে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ ও বিদ্রোহীকে হত্যা করে।

তবে ডেভিড রোমানো নামের এক মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ১৯৯১ সালের সেই বিপর্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে ‘অপারেশন প্রোভাইড কমফোর্ট’ শুরু করে এবং নো-ফ্লাই জোন চালু করে। এর ফলেই পরে ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের ভিত্তি তৈরি হয়। যদিও তিনি স্বীকার করেন, ১৯৭৫ সালে ফল ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।

সিরিয়ার জটিল বাস্তবতা
আজ ইরানি কুর্দিদের অস্ত্র ধরতে বলার মধ্যে এক ধরনের তিক্ত বিদ্রূপও রয়েছে। কারণ পাশের দেশ সিরিয়ায় কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের পতন সম্প্রতি ঘটেছে।

বহু বছর ধরে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স (এসডিএফ) ছিল আইএসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র। তারা ২০১৯ সালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করতে বড় ভূমিকা রাখে।

কিন্তু জানুয়ারিতে, বাশার আল আসাদের পতনের এক বছরের কিছু বেশি সময় পর, ট্রাম্প প্রশাসন দামেস্কের নতুন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সমর্থন জানায় এবং কার্যত এসডিএফ ও কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

সিরিয়ায় মার্কিন দূত থমাস বারাক ঘোষণা করেন, এসডিএফের মূল উদ্দেশ্য প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসডিএফ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ হারায়।

ফলে পুরো অঞ্চলের কুর্দিদের কাছে বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—সংখ্যালঘুদের নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো বিশ্বাসযোগ্য নয়।

মাহমুদ আলুচ বলেন, ইরান প্রসঙ্গে কুর্দিদের দ্বিধার অন্যতম কারণ এটিই। তার ভাষায়, সিরিয়ায় পাওয়া ‘গতকালের ছুরিকাঘাতের ক্ষত এখনো শুকায়নি।’

হিসাবি প্রত্যাখ্যান ও ইরানের ঝুঁকি
নিজেদের সেনা পাঠানো এড়িয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘স্থলবাহিনী’ খুঁজছে। কিন্তু ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী এরবিলের নেতৃত্ব জানে, এতে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

মাসউদ বারজানি সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, এই অঞ্চল কোনো সংঘাতের পক্ষ হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৭ সালে কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার গণভোটকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন না দেওয়ায় বারজানি এখনো ক্ষুব্ধ। ডেভিড রোমানোর মতে, যেহেতু বাগদাদ সরকার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাই এরবিলও সহজেই ওয়াশিংটনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

তবে ইরানি কুর্দিদের হিসাব ভিন্ন হতে পারে। রোজহেলাতি নামে পরিচিত এই কুর্দিরা ১৯৪৬ সালে সোভিয়েত সমর্থন হারিয়ে এবং পরবর্তী ইরানি সরকারগুলোর অধীনে দীর্ঘদিন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ফলে তারা এটিকে তাদের অবস্থান বদলের ‘প্রথম ও শেষ সুযোগ’ হিসেবেও দেখতে পারে।

তবে আলুচ সতর্ক করেছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি দৃঢ় সামরিক প্রতিশ্রুতি না দেয়, যা ট্রাম্প দিতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে, তাহলে এমন পদক্ষেপ ইরানের শক্তিশালী সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখে ‘আত্মঘাতী’ হয়ে উঠতে পারে।

আঞ্চলিক ভেটো
ইরানি কুর্দিদের খোলা সংঘাতে ঠেলে দেওয়া অত্যন্ত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে তুরস্ক এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

আলুচের মতে, আঙ্কারা সম্ভাব্য যেকোনো বিদ্রোহ দমন করতে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত এমন বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে পারে না যা ‘আঞ্চলিক চতুষ্টয়’—তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও ইরাক—এর স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।”

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস দেখায়, পরিবর্তিত ভূরাজনীতির মূল্য প্রায়শই কুর্দিদেরই দিতে হয়েছে। ইরানে নিজের সেনা না পাঠিয়ে কম খরচে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। কিন্তু কুর্দিরা এখন হয়তো আমেরিকার প্রলোভনসঙ্কুল প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ১৯৭৫, ১৯৯১ এবং সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার রক্তাক্ত শিক্ষা মিলিয়ে দেখছে।

আল জাজিরা অবলম্বনে