
পিয়েরলুইজি কলিনা
দুয়ারে কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। মাঠের লড়াইয়ে মেতে উঠবে দলগুলো, আর সেই সাথে আবারও লাইমলাইটে চলে আসবে রেফারির বাঁশি আর বিতর্কিত সব সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিশ্বকাপের এই আবহেই বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তরা মিস করছেন এমন একজনকে, যার মাঠে থাকা মানেই ছিল শতভাগ নিখুঁত সিদ্ধান্ত আর নিষ্কণ্টক ফুটবল। বর্তমানের ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির যুগেও সবাই যেন ব্যাকুল হয়ে মিস করেন সবুজ মাঠের সেই অঘোষিত ঈশ্বরকে, যার চোখের ইশারায় থমকে যেত পুরো স্টেডিয়াম, যার একটি সিদ্ধান্ত মানেই ছিল শতভাগ নিখুঁত সুর। তিনি আর কেউ নন, রেফারিং দুনিয়ার জীবন্ত কিংবদন্তি—পিয়েরলুইজি কলিনা।
কৈশোরের স্বপ্ন ও বাঁশি হাতে রাজত্ব
১৯৬০ সালে ইতালির বলোনিয়া শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ক্ষ্যাপাটে তরুণের চোখেও ছিল ফুটবলার হওয়ার আদিম স্বপ্ন। কিন্তু ১৭ বছর বয়সে যখন বুঝতে পারলেন বুট জোড়া পায়ে মাঠ মাতানোর মতো পর্যাপ্ত জাদু তাঁর স্কিলে নেই, তখনই এক বন্ধুর হাত ধরে কৌতূহলবশত নাম লেখান রেফারিং কোর্সে। অভিজ্ঞতা অর্জনের সেই ছোট ইচ্ছাই যে একদিন তাঁকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম আসনে বসাবে, তা কে জানত! মাত্র ৩০ বছর বয়সেই সবাইকে চমকে দিয়ে বাঁশি হাতে নেমে পড়েন ইতালির প্রথম সারির লিগ ‘সিরি-আ’র মূল মঞ্চে।
চেহারার রুদ্ররূপ এবং মিলিটারির ইস্পাত-কঠিন ছায়া
৩৫ বছর বয়সে এসে এক আকস্মিক ‘অ্যালোপেশিয়া’ রোগ কেড়ে নেয় তাঁর মাথার সব চুল। দুই গালে ভাঙা চাহনি আর কোটরে ডেবে যাওয়া দুই ঘোলাটে চোখের মণি—কলিনাকে যেন এক অতিপ্রাকৃতিক রূপ এনে দেয়। মাঠে তাঁর সেই ভয়ংকর হাসির সামনে তর্ক করার আগে দশবার ভাবতেন বাঘা বাঘা ফুটবলাররা। মজার ছলে বলা হতো, বাঘের মুখ থেকে ফেরা সম্ভব হলেও কলিনার থাবা থেকে নিস্তার নেই কারও!
তবে এই রুদ্ররূপের আড়ালে ছিল এক অসামান্য ফিটনেস ও কঠোর শৃঙ্খলাবোধ, যার শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনের সময়। মিলিটারির সেই অমানুষিক পরিশ্রমই তাঁকে দিয়েছিল পুরো ৯০ মিনিট সমতা বজায় রেখে চিতার মতো দৌড়ানোর ক্ষমতা। ফলে মাঠে বল যেখানে থাকত, কলিনার ঈগলের মতো প্রখর দৃষ্টিও থাকত ঠিক তার ইঞ্চিখানেক দূরত্বে।
ফাইনালের জাদুকর ও বিরল সম্মান
১৯৯৫ সালে মাত্র ৪৩টি প্রথম বিভাগের ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিফার অফিশিয়াল ব্যাজ পান কলিনা। এরপর আন্তর্জাতিক ফুটবলের আকাশজুড়ে শুরু হয় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য। ১৯৯৬ সালের অলিম্পিকে আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়ার সেই ঐতিহাসিক মেগা ফাইনাল দিয়ে বড় মঞ্চে তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর থেকে বিশ্ব ফুটবলের যেকোনো মহাযুদ্ধ মানেই ছিল কলিনার কম্পিউটারের মতো নিখুঁত সিদ্ধান্ত।
কোপার আসর থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালের বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যকার সেই রূপকথার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল কিংবা ২০০২ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ ফাইনাল—নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মোট ১১টি রাজকীয় ফাইনাল সুন্দরভাবে পরিচালনা করেছেন এই ইতালিয়ান জাদুকর।
২০০৫ সালে নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ বছর বয়সে তাঁর অবসরের সময় ঘনিয়ে এলে পুরো ফুটবল বিশ্ব যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। সবাই চাইছিল ২০০৬ এর জার্মান বিশ্বকাপে কলিনাই থাকুন মাঠের প্রধান চালিকাশক্তি। ফুটবলপ্রেমী আর খেলোয়াড়দের সেই আকুল আকুতিকে সম্মান জানিয়ে ইতালির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের নিয়ম বদলে রেফারির অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৪৬ বছর করেছিল, যা ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল নজির।
ইতিহাসের পাতায় অমর এক বিস্ময়
৬২ বছর বয়সী এই ইতালিয়ান তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে রেকর্ড ৬ বার জিতেছেন ‘ফিফা বেস্ট রেফারি অফ দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, রেফারি কেবল মাঠের একজন খণ্ডকালীন বিচারক নন, চাইলে নিরপেক্ষতা আর সততার জোরে ফুটবলারদের চেয়েও বড় আইকন হয়ে কোটি ভক্তের হৃদয়ে রাজত্ব করা যায়।
ফুটবল দুনিয়ায় বহু রেফারি আসবেন, বহু রেফারি চলেও যাবেন; কিন্তু রুপালি পর্দার ওপারে সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে পিয়েরলুইজি কলিনা বেঁচে থাকবেন ফুটবল ভক্তদের হৃদয়ে—এক চিরন্তন মহাকাব্য, এক অনন্ত বিস্ময় হয়ে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প


















































