বুধবার । জুন ১৭, ২০২৬
মাহমুদ মেনন খান, সহকারী অধ্যাপক, ডব্লিউইউএসটি প্রবাস ১৭ জুন ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

‘মম আই ডিড ইট’—ডব্লিউইউএসটি’র ২০২৬ ব্যাচের গ্র্যাজুয়েশন উদযাপন


WUST cover

এবারের সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯০ জন শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন

‘মম. আই ডিড ইট (মা, আমি পেরেছি)’
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ডব্লিউইউএসটি)-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তনে এক শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েশন ক্যাপে লেখা এই চারটি শব্দ যেন পুরো অনুষ্ঠানের আবেগকে ধারণ করেছিল। শিক্ষার্থীটির নাম জানা হয়নি, কিন্তু তার এই বার্তা মনে করিয়ে দেয়, একটি ডিগ্রি শুধু একজন শিক্ষার্থীর অর্জন নয়, এর পেছনে থাকে পরিবার, ত্যাগ, সংগ্রাম এবং অজস্র স্বপ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্সে উডসন হাই স্কুল অডিটোরিয়ামে গত ১৩ জুন অনুষ্ঠিত এবারের সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯০ জন শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর মধ্যে স্কুল অব ইনফরমেশন টেকনোলজি থেকে ১৮৩ জন এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে ১০৭ জন শিক্ষার্থী স্নাতক হন।

কালো গাউন আর হ্যাটের উপর সোনালি ট্যাসেল ঝুলিয়ে শিক্ষার্থীরা সমাবর্তন আয়োজনে আসে। তাদের পদচারণায় পুরো অডিটোরিয়াম উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। পরিবার-পরিজন, বন্ধু, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বের সঙ্গে ছবি তোলা ও আনন্দ ভাগাভাগিতে মুখর ছিল পুরো পরিবেশ।

সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও চেয়ারম্যান আবুবকর হানিপ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আজ শুধু ডিগ্রি অর্জনের দিন নয়, এটি অধ্যবসায়, ত্যাগ এবং সম্ভাবনার উদযাপন।’ তিনি দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে শিক্ষার্থীদের আজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, ‘ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে শেখে, মানিয়ে নেয় এবং এগিয়ে যায়।’

অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ ড. খালিদ এইচ. আরার। টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটির এই অধ্যাপক ডব্লিউইউএসটির গ্রাজুয়েটদের স্মরণ করিয়ে দেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও মানবিক গুণাবলিই মানুষের প্রকৃত শক্তি। তিনি বলেন, ‘এআই স্রেফ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, উত্তর দিতে পারে; কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া, জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা এবং মানবিক সংযোগ তৈরি করা শুধু মানুষের পক্ষেই সম্ভব।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভার্জিনিয়া স্টেট সিনেটর সাদ্দাম আসলান সেলিম, উদ্যোক্তা রফিক হাওলাদার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএফও ফারহানা হানিপ। তারা শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, মানবিক মূল্যবোধ এবং পেশাগত উৎকর্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপ তার বক্তৃতায় আরও বলেন, স্নাতক ডিগ্রি অর্জন কেবল একটি একাডেমিক সাফল্য নয়, বরং বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি। তিনি শিক্ষার্থীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে তারা এমন এক সময়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে, যখন প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

আবুবকর হানিপ বলেন, ধারাবাহিকভাবে শেখার মানসিকতাই তার সামনে নতুন নতুন সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে

‘পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভবিষ্যৎ তাদের জন্য, যারা শিখতে জানে, পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে এবং প্রতিনিয়ত বিকশিত হতে থাকে,’ বলেন তিনি।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আবুবকর হানিপ বলেন, ধারাবাহিকভাবে শেখার মানসিকতাই তার সামনে নতুন নতুন সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে। তিনি শিক্ষার্থীদের আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, শিক্ষা কখনোই ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় না।

চ্যান্সেলর হানিপ বিশ্ববিদ্যালয়ের WISE Accelerator-এর কথাও উল্লেখ করেন। তিনি নবীন গ্র্যাজুয়েটদের উদ্যোক্তা হওয়ার, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করার এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গ্র্যাজুয়েশনের দিনেই শেষ হয়ে যায় না; বরং এটি আজীবনের একটি বন্ধন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ডব্লিউইউএসটিকে স্রেফ তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয় বরং প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের সারা জীবনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।’

মূল বক্তা ড. খালিদ আরার তার দীর্ঘ বক্তৃতায় শিক্ষার্থীদের আত্মপরিচয় জানার, নিজের শক্তি চিহ্নিত করার এবং অন্যদের জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সফলতা শুধু নিজের অর্জনেই নিহিত নয়; বরং অন্যদের অর্জনে সহায়তা করার মধ্য দিয়েও সফলতা পরিমাপ করতে হবে।’

নিজের জীবনের গল্প তুলে ধরে ড. আরার বলেন, একজন চতুর্থ প্রজন্মের বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি হিসেবে তিনি শৈশবে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, কিন্তু তিনি সেই বাধাকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন। তাঁর ভাষায়, জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোই মানুষকে তার প্রকৃত সামর্থ্য আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।

তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকের গল্পটি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দৃঢ়তা এবং সংগ্রামের চেতনা এক ও অভিন্ন।’

তিনি শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী, সৎ, সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক নেতৃত্ব, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং সহযোগিতার মানসিকতাই একজন মানুষকে এগিয়ে রাখবে।

বক্তৃতার শেষ অংশে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি দিকনির্দেশনা দেন—নিজেকে জানো, নিজের শক্তি ও সামর্থ্যকে চিনতে শেখো এবং নিজের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করো।

তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিয়ে নেতৃত্ব দিতে, বিনয়ের সঙ্গে সেবা করতে এবং সাহসের সঙ্গে উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে যেতে আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ফারহানা হানিপ বলেন, ‘আজ আপনারা আমাদের ক্যাম্পাস ছেড়ে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনারা সবসময়ই ডব্লিউইউএসটি’র পরিবারের অংশ হয়ে থাকবেন।’

‘অধ্যবসায় এমন একটি শক্তি, যা কেউ আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না,’ বলেন সাদ্দাম আজলান সেলিম।

আর রফিক হাওলাদার বলেন, ‘প্রযুক্তি শুধু আমাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম বদলে দেয়, কিন্তু পৃথিবীকে বদলে দেয় মানুষ।’ শিক্ষার্থীদের সেই মানব সম্পদ হয়ে ওঠার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন ভ্যালেডিক্টোরিয়ান রিথিন সাইন মানাপতি, শিক্ষা শেষে এরই মধ্যে গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছেন ডব্লিউইউএসটির এই শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘ডব্লিউইউএসটি আমাকে যে ভিত্তি দিয়েছে, তার ওপর দাঁড়িয়েই আমি আজকের এই অর্জনে নিশ্চিত করতে পেরেছি।’

WUST 2

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও মানবিক গুণাবলিই মানুষের প্রকৃত শক্তি

এমবিএ গ্র্যাজুয়েট বিলগেন আতালেই বলেন, ডব্লিউইউএসটি-তে পড়াশোনা তাকে শুধু একাডেমিক জ্ঞানই দেয়নি, বরং দল পরিচালনা ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। বিএসবিএ গ্র্যাজুয়েট মাহা সাজিদ ভবিষ্যৎকে ভয়ের নয়, সম্ভাবনার চোখে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমার ডিগ্রি আমাকে শুধু একাডেমিক জ্ঞান দেয়নি; এটি আমাকে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং শিল্পখাতে কাজের জন্য প্রস্তুত একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।’

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে প্রেসিডেন্ট ড. হাসান কে. বার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে স্নাতকদের ডিগ্রি প্রদান ঘোষণা করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা তাদের ট্যাসেল ঘুরিয়ে ছাত্রজীবন থেকে অ্যালামনাই জীবনে প্রবেশের প্রতীকী মুহূর্ত উদযাপন করেন। মুহূর্তের মধ্যেই শত শত গ্র্যাজুয়েশন ক্যাপ আকাশে উড়ে যায়, করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম।

অনুষ্ঠান শেষে আবারও মনে পড়ে সেই ক্যাপে লেখা তিনটি শব্দ—

‘মা, আমি পেরেছি।’

তিনটি শব্দ, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, বছরের পর বছর পরিশ্রম এবং নতুন এক যাত্রার সূচনা। আর এভাবেই শেষ হয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ২০২৬ সালের সমাবর্তন।