রবিবার । জুন ২১, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ১৭ জুন ২০২৬, ১:৩০ অপরাহ্ন
শেয়ার

যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল

এক ছোট্ট পেশির উৎকণ্ঠা


পুলিসিচকে ঘিরে উৎকণ্ঠা যুক্তরাষ্ট্র শিবিরে

বিশ্বকাপে সাধারণত শিরোনাম হয় গোল, জয় কিংবা কোনো তারকার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। কিন্তু কখনও কখনও একটি দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষা আটকে যায় একজন ফুটবলারের শরীরের একটি ক্ষুদ্র অংশের ফিটনেসে। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমনই একটি অংশ  ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচের বাঁ পায়ের কাফ—পায়ের পেছনের পেশি।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রেট পার্কে যুক্তরাষ্ট্র দলের অনুশীলন চলছে। সাংবাদিকরা মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু তাদের নজর বল কিংবা কৌশলগত অনুশীলনের দিকে নয়। সবার কৌতূহল একটাই—পুলিসিচ কোথায়? তিনি কি খেলতে পারবেন? তার কাফের অবস্থা কতোটা গুরুতর?

প্রতিদিন একই প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর যেন একই রকম অস্পষ্ট।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মাত্র ৪৫ মিনিট খেলেই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তারকাকে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর বিরতির সময় তাকে বদলি করে তুলে নেওয়া হয়। পরে পুলিসিচ ও কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনো জানান, ম্যাচের দুই দিন আগে অনুশীলনে তার কাফে আঘাত লেগেছিল। ম্যাচ চলাকালীন আবারও একই জায়গায় ধাক্কা খাওয়ার পর পেশিটি শক্ত হয়ে আসে। ঝুঁকি এড়াতেই তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়।

সেদিন দুজনের কথাতেই ছিল আশাবাদ।

“আমি আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবো,” বলেছিলেন পুলিসিচ।

পোচেত্তিনোও বলেছিলেন, “আশা করি এটা বড় কোনো সমস্যা নয়।”

তাই যুক্তরাষ্ট্রের ৪-১ গোলের জয়ের আনন্দে তখন ছেদ পড়েনি। কিন্তু পরদিন থেকেই শুরু হয় উদ্বেগ।

২০ জুন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের জন্য অনুশীলনে যখন দলের অন্য ২৫ জন খেলোয়াড় বল দখলের অনুশীলনে ব্যস্ত, তখন পুলিসিচকে দেখা যায় মাঠের দূর প্রান্তে দুইজন ফিটনেস কোচের সঙ্গে আলাদা কাজ করতে। কখনও এক পায়ে লাফ, কখনও পাশ বদলে দ্রুত নড়াচড়া—সবই  ফুটবল পিচে দ্রুত ফিরে আসার অদম্য প্রচেষ্টার অংশ।

প্রশ্নগুলো তখন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

এটা কি নিছক সতর্কতা? নাকি সত্যিই চোট গুরুতর? অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরের ম্যাচে তিনি কি খেলতে পারবেন?

দলের সতীর্থরা অবশ্য এসব নিয়ে চিন্তিত নন।

অধিনায়ক টাইলার অ্যাডামস আমেরিকান সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, “সবাই একটু শান্ত হোন। ক্রিশ্চিয়ান প্রস্তুত থাকবে।”

সংবাদ সম্মেলনে টাইলার অ্যাডামসন

মিডফিল্ডার সেবাস্টিয়ান বেরহাল্টারও একই সুরে বলেন, “আমি নিশ্চিত, সে খেলতে পারবে।”

কিন্তু আশ্বাসের মাঝেও রহস্য রয়েই গেছে। কারণ অনুশীলনের যে ১৫ মিনিট সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত ছিল, সেখানে পুলিসিচকে দেখা যায়নি। মাঠে ছিলেন তার মা, এজেন্ট এবং পরিবারের সদস্যরা; কিন্তু দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় তখন জিমের ভেতরে, ক্যামেরার আড়ালে ব্যক্তিগত অনুশীলনে ব্যস্ত।

ফলে প্রশ্নটা এখনও ঝুলে আছে—তিনি কি খেলবেন?

সত্যি বলতে, সম্ভবত এটাই যুক্তরাষ্ট্র দলের উদ্দেশ্য।

ফুটবলে চোটের খবর গোপন রাখা নতুন কিছু নয়। বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি প্রায় একটি কৌশলগত অস্ত্র। প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত রাখতে কোচেরা প্রায়ই প্রকৃত তথ্য আড়াল করেন।

২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, স্ট্রাইকার জোজি আলটিডোর “প্রস্তুত “। পরে জানা যায়, তার হ্যামস্ট্রিংয়ে দ্বিতীয় মাত্রার ছিঁড়ে যাওয়া চোট ছিল, যা নিয়ে তিনি আদৌ খেলার মতো অবস্থায় ছিলেন না।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ঘটনা আরও অনেক।

১৯৯৪ সালের ফাইনালের আগে ইতালিতে আলোচনা ছিল রোবের্তো বাজ্জিওর হ্যামস্ট্রিং নিয়ে। ২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডে জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল ডেভিড বেকহ্যামের ভাঙা পায়ের হাড়।

২০২২ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের ইনজুরি

২০০৬ সালে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় ওয়েইন রুনি। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ায় স্যাম কেরকাফ ইনজুরি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সেটিকে সংবাদমাধ্যম “জাতীয় আবেশ” বলে অভিহিত করেছিল।

পুলিসিচের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনও সেখানে পৌঁছায়নি। তবে আমেরিকান ফুটবলপ্রেমীদের জন্য তার বাঁ কাফ এখন নিঃসন্দেহে জাতীয় উদ্বেগের একটি বিষয়।

২০২২ বিশ্বকাপেও এমন হয়েছিল। ইরানের বিপক্ষে গোল করতে গিয়ে পেলভিসে আঘাত পেয়েছিলেন পুলিসিচ। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচের আগে তিন দিন ধরে তার খেলা নিয়ে জল্পনা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের আগের দিন তাকে ফিট ঘোষণা করা হয়।

এবারও অধিকাংশের ধারণা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিনি খেলবেন। কিন্তু কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।

হয়তো চোটটি তেমন গুরুতর নয় এবং শুক্রবারের আগেই পুরোপুরি সেরে যাবে। আবার এটাও হতে পারে, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই এটি একটি লুকিয়ে থাকা উদ্বেগ হয়ে থাকবে।

কিন্তু আপাতত যুক্তরাষ্ট্র দল মুখে কুলুপ এঁটেছে।

তাই ক্যালিফোর্নিয়ার আরভাইন থেকে সিয়াটল—যেখানেই যুক্তরাষ্ট্র দল যাবে, সেখানেই সাংবাদিকদের দৃষ্টি খুঁজে ফিরবে একটি জিনিসকে।

ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচের বাঁ পায়ের কাফ।

কারণ কখনও কখনও একটি দেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন নির্ভর করে একজন ফুটবলারের পায়ের একটি ছোট্ট পেশির ওপর। আর এই মুহূর্তে আমেরিকার জন্য সেটিই সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গ।