
ভারতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে টানা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থকেরা। পুলিশের চাপ ও নির্দেশ উপেক্ষা করে তারা রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন এবং আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
জুনের তীব্র গরমের মধ্যেও দিল্লির বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতে রাত কাটিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। দ্বিতীয় দিনে আন্দোলনে আরও মানুষ যোগ দেন। পুরো এলাকায় ছিল কড়া পুলিশি উপস্থিতি।
এই আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দীপকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তিনি চলতি মাসের শুরুতে ভারতে ফিরে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতিবাদকে সরাসরি রাজপথে নিয়ে আসেন। তার দাবি, দেশের তরুণদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশারই বহিঃপ্রকাশ এই আন্দোলন।
ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বয়স ২৫ বছরের নিচে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফলাফল নিয়ে অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তরুণদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
এই ক্ষোভকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের প্রধান দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল অনেকটা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যে তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে সমালোচনা ওঠে। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিজিৎ দীপকে লিখেছিলেন, ‘যদি সব তেলাপোকা এক হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?’ সেই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
এরপর তিনি একটি ওয়েবসাইট চালু করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ইনস্টাগ্রামে দলটির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীর সংখ্যারও দ্বিগুণ।
৬ জুন দিল্লিতে প্রথম বিক্ষোভ আয়োজনের পর আন্দোলনটি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও নাগপুরসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শত শত তরুণ এতে অংশ নিচ্ছেন।
দিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল জন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী সচিন কুমার। তিনি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য এক বছর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে সেই পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সচিন বলেন, ‘এটা আমার মানসিক শক্তি ভেঙে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভুগছে, কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনছে না।’
রোববার প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিলেও সচিন পরীক্ষাকেন্দ্রে না গিয়ে বিক্ষোভস্থলেই থেকে যান।
প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ভারত সরকার সাময়িকভাবে টেলিগ্রাম অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে। তবে সরকারের সমালোচকেরা এই পদক্ষেপকে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়, বরং ‘সাময়িক ব্যান্ডেজ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এক ডজনেরও বেশি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে আসে। এসব ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
সচিনের ভাষায়, ‘এখন আর এই পরীক্ষা কিংবা অন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতার ওপর আমার বিশ্বাস নেই। অযোগ্য মন্ত্রীদের কারণে সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
সচিন ও তার বন্ধু শুভঙ্কর—দুজনেরই এটি জীবনের প্রথম রাজনৈতিক বিক্ষোভ। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও তারা রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন এবং আপাতত বাড়ি ফেরার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
ভারতের কোটি কোটি তরুণের মতো তারাও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনকাল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রত্যক্ষভাবে দেখেননি। মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং এরপর থেকেই দেশ পরিচালনা করছেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শনিবার সন্ধ্যা থেকে দিল্লি পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করেছে। এমনকি কিছু সময়ের জন্য খাবার ও পানির সরবরাহও সীমিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তারা।
তবে গভীর রাতেও আন্দোলনস্থলে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। কেউ গান শুনেছেন, কেউ নাচ করেছেন, আবার কেউ গোল হয়ে বসে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, সরকার যদি মনে করে আমাদের ক্লান্ত করে সরিয়ে দেবে, তাহলে তারা ভুল করছে। আমরা এখানেই থাকব, যতক্ষণ না আমাদের দাবি পূরণ হয়।’








































