cosmetics-ad

যানজট যত, পুলিশের আয় তত

bogra

সকাল ৯টা। বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা এলাকা। দিনের শুরু থেকেই রিকশা, অটোরিকশার প্রচণ্ড চাপ। সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত গাড়িগুলো। সব মিলিয়ে ১০ মিনিটের রাস্তায় সময় পার হচ্ছে এ ঘণ্টা। সকাল ৮টা থেকে এখানে ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট থাকার কথা থাকলেও দেখা গেলো না কাউকেই। এ সময় সাজেন্ট আনোয়ার হোসেনকে দেখা গেল শহরের বাইরে বনানী বাইপাস মোড়ে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা আদায় করতে।

বেলা ১১টা। যানজটে শহরের প্রতিটি মোড়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এর মধ্যে সাতমাথায় প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে দেখা গেলো ট্রাফিক সার্জেন্ট আনোয়ার হোসেন ও ইফতেখার রহমানের মোটরসাইকেল বাণিজ্যের দৃশ্য। পাশেই প্রচণ্ড যানজট লেগে থাকলেও তা নিরসনে কোনো আগ্রহ নেই তাদের। তারা ব্যস্ত তুচ্ছ অজুহাতে মোটরসাইকেল আটকিয়ে ভুয়া মামলা দিতে। আর চালকদের বলে দিচ্ছেন রাতে দেখা করতে।

দুপুর ২টা। থানা মোড়ে সড়কের উপর দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল থেকে টাকা নিতে ব্যস্ত ট্রাফিকের টিএসআই মফিজুর রহমান। তিনি দালাল দিয়ে আদায় করছেন এই টাকা। আর একই কায়দায় ভুয়া মামলা দিয়ে রাতে দেখা করতে বলছেন ভুক্তভোগীদের। একই সময়ে শহরের নামাজগড়ে দেখা গেলো রিকশা ও অটোটেম্পুর সঙ্গে ট্রাকের মিলন মেলা। সেখানে কর্তব্যরত ট্রাফিকের টিএসআই তখনো বাসায় বিশ্রামে ছিলেন। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছিলেন তার মনোনীত কয়েকজন দালাল সদস্য। তারাই বেআইনীভাবে ঢুকে পড়া ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করছিলেন।

বগুড়া শহরে জনশ্রুতি রয়েছে, যানজট যত, পুলিশের আয় ততো। কথাটি বাইরের মানুষের কাছে অপরিচিত মনে হলেও বগুড়াবাসীর জন্য নতুন কিছু নয়। তাই দিন যতই যাচ্ছে, পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা ততই বাড়ছে। বগুড়ায় সাধারণ রিকশার পাশাপাশি ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অটোটেম্পুর যত্র তত্র পার্কিংয়ের কারণে এ যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

অটোরিকশার চালক বা মালিকদের দৌরত্ম্যের পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপক সমালোচনাও চলছে। বগুড়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ করে এ সকল অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগের কথা স্বীকারও করেছেন জেলার বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা। তারাও জানেন অবৈধ এ সকল যানবাহন শহরে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে সড়কের পাশে এক লাইনে দাঁড়িয়ে না থেকে এলোমেলো দুই বা ততোধিক লাইন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেই টাকা পায় ট্রাফিক পুলিশ।

যে কারণে অটোরিকশাগুলো শহরের ভেতরে এলোমেলো অবস্থায় বা যত্র তত্র পার্কিং করলেও পদক্ষেপ নিতে বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়ে থাকেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। এর মধ্যে নতুন যোগ হয়েছে মোটরসাইকেল ধরার বাণিজ্য। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও ভুয়া মামলা দেয়া হয়। যে মামলায় অপরাধের কোনো বিবরণ থাকে না। এরপর রাতে ট্রাফিক ফাঁড়িতে বসে সবনিম্ন ১ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে দফারফা করা হয় সেগুলো। রোববার এ ধরনের প্রায় ১০টি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে যাদের রাতে দেখা করতে বলা হয়েছে।

পৌর সূত্র জানিয়েছে, বৈধ হিসেবে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৫ হাজার রিকশার। বাকি রিকশাগুলো অবৈধ। এছাড়াও শহরে অবৈধ অটোরিকশা ও অটোবাইকের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা পৌর সপ্তপদী মার্কেটের ব্যবসায়ী আনোয়ার, গিয়াসসহ আরো কয়েক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, অটোরিকশার মালিকদের এতটাই দাপট যে, বেআইনিভাবে শহরে যত্র তত্র গাড়ির স্ট্যান্ড বানিয়ে সেখানে যাত্রী ওঠা-নামা করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না স্থানীয় প্রশাসন। বরং ট্রাফিক পুলিশ মাসিক ও দৈনিক ভিত্তিতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গাড়ি চালকদের এ ধরনের অবৈধ সুবিধা দিয়ে জনসাধারণের ভোগান্তির সৃষ্টি করছে।

একই ধরনের অভিযোগ করে কলেজ শিক্ষক আপেল, রবিউল হাসান, ব্যাংকার সুদীপ্ত । তারা বলেন, যানজট নিরসনে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা খুবই দুঃখজনক। জনসাধারণের ভোগান্তির কথা ভেবে সপ্তাহে একদিনও যদি পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতেন, তাহলে দ্রুত শহর যানজটমুক্ত হতো এবং দৌরাত্ম্য কম হতো এ সকল গাড়ি চালক বা মালিকদের।

বগুড়া জেলা জজ আদালতের কয়েকজন আইনজীবী বলেন, পুলিশ প্রশাসন ইচ্ছে করলে সংশ্লিষ্ট ধারায় একাধিক মামলা দিয়ে, জরিমানা করে, গাড়ি আটক করে সাতদিনের মধ্যে এ সকল বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু এক শ্রেণির ট্রাফিক পুলিশ অসৎ উদ্দেশ্যে এ সকল অটোরিকশার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে চায় না।

বগুড়া সদর ফাঁড়ির ট্রাফিক ইনচার্জ বিকর্ণ চৌধুরী পুলিশের বিরুদ্ধে টাকা গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জনবল কম হওয়ায় তারা সব সময় যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হন না এটা সত্যি। তবে তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন এ সকল সমস্যার সমাধান করতে।

বিআরটিএ, বগুড়ার মোটরযান পরিদর্শক হারুন উর রশিদ শহরে লাইসেন্সবিহীন অতিরিক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলের কথা স্বীকার করে জাগো নিউজকে জানান, বগুড়ায় বৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। কিন্তু শহরে রেজিস্ট্রেশনবিহীন ১০ হাজারেরও বেশি অটোরিকশা অবৈধভাবে চলাচল করছে। পুলিশ ইচ্ছে করলেই তাদের আটক করে একাধিক ধারায় মামলা দিতে পারে।
বিআরটিএ হিসেব মতে, শহরে মাত্র ৩৬শ` সিএনজিচালিত অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন রয়েছে। বাকি তিনগুণ সিএনজিচালিত অটোরিকশা নম্বর বিহীনভাবে চলছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। এছাড়া শহরের অভ্যন্তরে দিনের বেলায় ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে দিয়েই সাতমাথা হয়ে বাস ও বালুর ট্রাক চলাচল করে। এমনকি করতোয়া গেইট লক বাসগুলো সাতমাথায় বাণিজ্যিক কলেজের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে স্ট্যান্ড বানিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যাত্রী উঠানামা করায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রেজিস্ট্রেশনবিহীন অটোরিকশায় নয়, দিনভর শহর জুড়ে ছুটোছুটি করে বাইরের নম্বর প্লেট লাগানো প্রায় ২ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, জয়পুরহাট, নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলার নম্বর প্লেট লাগিয়ে দিব্যি চলছে এই সিএনজিচালিত অটোরিক্সাগুলো।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এক জেলার রেজিস্ট্রেশন নম্বরধারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা অন্য জেলায় চলাচল করতে পারে না। কিন্তু সব কিছুই ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগায় হচ্ছে। রহস্যজনকভাবে নির্লিপ্ত থাকছে ট্রাফিক পুলিশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দু`জন মালিক বলেছেন, প্রতিটি নম্বরবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রতি ৫শ ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রতি ৩শ টাকা করে মাসে ট্রাফিক পুলিশকে দিতে হয়। তাই এসব গাড়ি ট্রাফিক পুলিশ ধরে না। তবে মাঝে মধ্যে আটক করলেও রাতে পুলিশ এই গাড়িগুলো নিয়ে রণডিউটি করে।

এ ব্যাপারে বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান জাগো নিউজকে জানান, রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো বগুড়ায় চলাচল করলেও তার অধিকাংশ মালিক অন্য জেলার। এই জেলার মালিক হলে রেজিস্ট্রেশন করা সহজ হতো। তাই কিভাবে সিএনজি অটোরিকশাগুলোর রেজিস্ট্রেশন দেয়া যায় সে বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তের প্রয়োজন।

বগুড়া সদর ফাঁড়ির ট্রাফিক ইন্সপেক্টর বিকর্ণ চৌধুরী বলেন, শহরে যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। এখন ৩জন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ও ৩ জন সার্জেন্টসহ আছে মাত্র ৪০ জন। এজন্য যানজট নিয়ন্ত্রণে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, তিনি বরাবরই অন্যায়ের সঙ্গে আপোষহীন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার জন্য শুধু বিআরটিএ বা জেলা প্রশাসনই নয়, বগুড়া পৌরসভা চাইলেও পর্যাপ্ত পুলিশ দিতে প্রস্তুত আছেন। তবে হতাশার কথা যানজট নিরসনের লক্ষ্যে অন্যদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। আর কোনো পুলিশ সদস্য বেআইনী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লিমন বাসার, বগুড়া