জাপানের চিঠি : পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই চাকরি

japanধরুন, আপনি অনার্স চতুর্থ বর্ষে কিংবা মাস্টার্সে পড়ছেন। আর পড়াশোনা যেদিন শেষ হবে, তার পরদিনই চাকরিতে ঢুকতে চান- কেমন হয় বলুন তো? আপাত দৃষ্টিতে আমাদের কাছে বিষয়টা আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো মনে হলেও এটা জাপানের শিক্ষার্থীদের জন্য ডাল-ভাত। গত তিন বছর ধরে আমি অন্তত দশজন ল্যাবমেটকে দেখেছি, যারা পড়াশোনা করা অবস্থায় চাকরি পেয়ে যান।

একাডেমিক সেশন শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই জাপানের অনেকেই চাকরিতে ঢোকেন। এটা শুধু আমার ল্যাবমেটদের জন্য নয়, পুরো জাপানেই এই ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে।

পড়াশোনা করে আপনি কী করবেন, তার সিদ্ধান্তটি আপনাকে নিতে হবে। তবে আপনার সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়নে সহায়তা করবে আপনারই বিশ্ববিদ্যালয়। হ্যা, জাপানে সাধারণত কোনো কোম্পানি আপনাকে সরাসরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিয়োগ দেয় না। চাকরি পেতে হলে ‘চাকরি মেলা’য় অংশ নিতে হয়। আর সেখানেই পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়।

একাডেমিক সেশনের মতো এই দেশে বছরের দুইবার চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এক এপ্রিলে আর অক্টোবরে। এই দুই সেশনে চাকরি দেওয়ার জন্য ছয় মাস থেকে এক বছর আগেই কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের নিয়োগ দেয়।

nahidশুধু কোম্পানিই নয়, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও তাই। আর এই জন্য এই দেশের ছেলেমেয়েদের চাকরির খোঁজ করতে হয় অনার্স তৃতীয় বর্ষে আর মাস্টার্স প্রথম বর্ষ থেকে। আপনার সনদ ছাড়াই এরা আপনাকে নিয়োগ নিশ্চিত করবে। কারণ, এরা ধরেই নেন যে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের সনদ সময়মতো পাবে।

ধরুন, আপনি কোনো কারণে ফলাফল খারাপ করলেন, সেক্ষেত্রে আপনি হয়তো এক বছর পিছিয়ে গেলেন। তবে চাকরি আপনার কনফার্মই থাকে। যোগদানের পর সনদ দিতে হয়।

এরা মনে করে, আপনার প্রতিটি সেকেন্ড এই দেশের উন্নয়নে কাজে লাগুক। আপনার মূল্যবান সময় বসে না থেকে কর্মে ব্যয় করুন। সম্ভবত এই নীতির জায়গা থেকে জাপানিদের চাকরিদের জন্য কালক্ষেপণ করতে হয় না।

জাপানের এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের দেশকে একবার কল্পনা করুন তো, কী মেলে সেখানে? একবার ভাবুন তো, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কথা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কথা? তারা তাদের শিক্ষার্থীদের একটা-দুইটা সনদ তুলে দেওয়া ছাড়া কী করে?

এমনিতে ক্লাস নেয় না, তার ওপর সেশনজটে ওষ্ঠাগত জীবন নিয়ে আপনি যখন বের হবেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে, এরপর চাকরির পেছনে বছরের পর বছর ঘুরে জীবনের মূল্যবান সময় খুইয়ে ফেলবেন। তারপর চলবে নিয়োগ ব্যবস্থার ‘অপরিশোধিত’ পরিবেশন।

চার বছরের অনার্স সাড়ে পাঁচ বছরে শেষ করে যা যা পড়লেন, সেগুলো আপনার চাকরির পরীক্ষায় কাজে দিচ্ছে না। কাজে দিচ্ছে যেগুলো আপনি দশ বছর আগে পড়েছিলেন, সেগুলো। কি হাস্যকর পরিস্থিতিতে কর্মী নির্বাচন করেন তারা!

তারা পারেনও বটে! যেগুলো আপনার কোম্পানির সংশ্লিষ্ট নয়, সেইগুলো আপনি আপনার চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্ন করে বাছাই করছেন। যে ছেলেটা বা মেয়েটা তিন বছর চাকরির পড়াশোনা করেই পার করলো, সেই ছেলের অনার্স পড়ার দরকার ছিল কি?
যেসব প্রশ্ন চাকরিদাতারা করেন, সেগুলোর জন্য তো অনার্স প্রয়োজন নেই। এইচ.এস.সি. পড়ে জব গাইডগুলো চর্চা করলেই তো সেরা হওয়া যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠের হেতু কী?

চাকরির জন্য দৌড়াদৌড়ি করে যে সময় নষ্ট হলো, সেটা তো আখেরে দেশের জন্যই ক্ষতি। ফলাফল প্রকাশের দীর্ঘসূত্রিতার জের ধরে বছরের পর বছর অপেক্ষা করানোর প্রয়োজন তো নেই।

চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে লাখ টাকা খরচ না করে যৌথভাবে এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনার কোম্পানির মৌলিক বিষয় আলোচনা করে চাকুরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করুন। তারপর ফ্রেশ শিক্ষার্থীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোম্পানিতে আনুন। আপনারা যে অভিজ্ঞতা চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেন, সেটা বন্ধ করুন। এইসব যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না।

ক্যারিয়ার বিষয়ক সচেতনতা তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও নিতে হবে। কেবল সনদ দিয়ে পার করানো নয়, দক্ষ মানবশক্তি তৈরি করাও একজন শিক্ষকের কর্তব্য বটে। সময়মতো একাডেমিক সেশন পার করে দেওয়ার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।

আসুন, দেশটাকে আমরা পরিবর্তন করি। সেকেলে নিয়মগুলোকে কাটাছেড়া করে নতুনত্বের স্বাদ নিয়ে আমাদের তরুণ সমাজকে দেশ গঠনে সহায়তা করি। ভালো কাজের শুরুটা আপনি করুন, দেখবেন অন্যরাও আপনার পথে পা বাড়াচ্ছে। তারুণ্যের শক্তিটাকে কাজে লাগান।

লেখক: এস এম নাদিম মাহমুদ, জাপান থেকে
ইমেইল: nadim.ru@gmail.com
সৌজন্যে: বিডিনিউজ