মঙ্গলবার । মার্চ ১০, ২০২৬
মাহবুব কিংশুক আন্তর্জাতিক ১০ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

ইরানে ট্রাম্পের শেষ লক্ষ্য কী?


Iran Trump

বিশ্লেষকদের মতে, হামলার ধরন দেখে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় লক্ষ্য ছিল ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া

২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধেরর দুই দশকের বেশি সময় পর আবারও মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার তারা মিত্র ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, যা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। তবে যুদ্ধ যতই তীব্র হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে আসলে কী অর্জন করতে চান—তা নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও অবস্থান বারবার বদলানোয় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে: এই যুদ্ধে ওয়াশিংটনের শেষ লক্ষ্য বা ‘এন্ডগেম’ কী?

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। হামলার লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক স্থাপনা, তেল শোধনাগার, সামরিক অবকাঠামো এবং বেসামরিক এলাকা। একটি স্কুলে বোমা হামলায় বহু শিশুও নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানও শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন ছুড়ে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং দূতাবাস।

বিশ্লেষকদের মতে, হামলার ধরন দেখে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় লক্ষ্য ছিল ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া বা অন্তত এতটাই দুর্বল করা যাতে তা টিকে থাকতে না পারে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি “রেজিম চেঞ্জ” বা সরকার পতনের কথা বলেনি, তবুও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো থেকে অনেকেই ধারণা করছেন যে এমন একটি লক্ষ্যই সামনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ভাঙন দেখা যায়নি। বরং ইরান দ্রুতই নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন করেছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে দেশের ক্ষমতাকাঠামোকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে।

যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের বক্তব্যে আরেকটি দিকও দেখা গেছে, যেখানে তিনি কখনও কখনও সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ করলে ক্ষমা করার প্রস্তাব দেন এবং ইরানি কূটনীতিকদের সরকার থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। কিন্তু বাস্তবে আইআরজিসি-ই এখন ইরানের পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তারা নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছে। ফলে যুদ্ধ চলাকালে এমন সমঝোতার সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। বিশেষ করে দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা এখন ইরানের আকাশসীমার ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, শুধু সামরিক শক্তি ধ্বংস করলেই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়, কারণ বাইরে থেকে হামলা চালিয়ে একটি দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করা যায় না।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন যে স্বাধীনতার সময় এসে গেছে এবং যুদ্ধ শেষ হলে জনগণই যেন নিজেদের সরকার গঠন করে। কিন্তু পরে তিনি আবার বলেন যে নতুন নেতৃত্ব ইরানের ভেতর থেকেই আসা উচিত। এতে নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনাকে তিনি কার্যত কমিয়ে দেন। একই সময়ে ট্রাম্প আবার দাবি করেন যে ইরানের নতুন নেতা কে হবে সে বিষয়ে তারও মতামত থাকা উচিত। ৬ মার্চ তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না যদি না তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে এবং এরপর একটি “গ্রহণযোগ্য নেতা” নির্বাচন করা হয়। তবে তেহরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা আত্মসমর্পণ করবে না, বোমাবর্ষণের মধ্যে আলোচনা করবে না এবং বাইরের চাপের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ মেনে নেবে না।

আরেকটি সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে কুর্দি বাহিনীকে ব্যবহার করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং ইরাকের এরবিল অঞ্চলে তাদের অবস্থান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা বা ঐক্য কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নেই। তাছাড়া এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে তুরস্ক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আঘারচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল আক্রমণ চালায়, তার জন্যও ইরান প্রস্তুত। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে এটি সবচেয়ে কম সম্ভাবনাময় বিকল্প। কারণ ট্রাম্প নির্বাচনে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন এবং ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখনও মার্কিন রাজনীতিতে নেতিবাচক স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধের লক্ষ্য আরও বড় হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে এবং তারা এই সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের হামাস ইসরায়েলে হামলার পর থেকে ইসরায়েল মনে করছে যে অঞ্চলটির শক্তির কাঠামো নতুনভাবে গড়ে তোলার সময় এসেছে।

সব মিলিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যুদ্ধের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাপ্তি হতে পারে একটি চাপের মধ্যে করা সমঝোতা। অর্থাৎ ইরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দেবে—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা বা আঞ্চলিক প্রভাব কমানো—আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হয়তো একটি চুক্তি করে ঘোষণা করতে চাইবেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করেছে—খামেনি নিহত হয়েছেন, ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়েছে এবং ওয়াশিংটন বিজয়ী হয়েছে। কারণ পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।

আল জাজিরা অবলম্বনে

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প