
ইরান যদি প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫০টির কম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে তারা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে—যদি তারা প্রতিটি হামলায় নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনে। এমনটাই মনে করছেন বিশষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা গ্লোবাল এন্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের গবেষণা ফেলো আরমান মাহমুদিয়ান মিডেল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তাতে ইরানের কাছে এখনও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে।
তার মতে, মূল বিষয় হলো প্রতিটি হামলায় নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমানো। ইরান যদি প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫০টির কম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে তারা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
মাহমুদিয়ান জানান, ইরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব নেই। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধক্ষেত্র বিস্তৃত হওয়ায় তারা স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ নিজেদের বড় অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভর করতে পারছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমালে এর প্রভাবও কমে যাবে। তার ভাষায়, ‘প্রতিটি হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে গেলে সেই হামলার ক্ষয়ক্ষতিও কম হবে, বিশেষ করে ইসরায়েলের জন্য, কারণ দেশটি ইরান থেকে অনেক দূরে।’
ইরানের দুটি বড় চ্যালেঞ্জ
মাহমুদিয়ান বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি বড় অপারেশনাল সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যাগুলো ২০২৫ সালের জুনেও দেখা গিয়েছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল টানা ১২ দিন ইরানে হামলা চালিয়েছিল।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী লঞ্চার হারানো। দ্বিতীয়ত, যেটি কম আলোচিত—ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে সংরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কাছে পৌঁছানো।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার দাবি করেছে যে তারা ৩০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার অকার্যকর করে দিয়েছে।
‘মিসাইল সিটি’ লক্ষ্য করে হামলা
ইরানের অনেক অস্ত্র ভূগর্ভস্থ শক্তিশালী ঘাঁটিতে সংরক্ষিত থাকে, যেগুলোকে ‘মিসাইল সিটি’ বলা হয়। মাহমুদিয়ান বলেন, ১২ দিনের সংঘাতে ইসরায়েল এসব ঘাঁটির প্রবেশপথ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল, ফলে ইরানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র বের করে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এসব ঘাঁটির প্রবেশদ্বার আক্রমণ করে বন্ধ করে দেয়। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে পৌঁছানো সীমিত হয়ে পড়ে। ইরান পথ খুলতে চেষ্টা করে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার তা বন্ধ করে দেয়।’
যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং লঞ্চার ধ্বংস হতে থাকে, তাহলে ইরান বাণিজ্যিক ট্রাককে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারে রূপান্তর করার মতো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে সময় লাগে এবং এমন স্থাপনা দরকার যা শত্রুর হামলার লক্ষ্য হবে না।
যুদ্ধের খরচ বাড়ছে
মাহমুদিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য হোয়াইট হাউজ অতিরিক্ত ৫০ বিলিয়ন ডলার বাজেট চেয়েছে বলে খবর রয়েছে।
তার মতে, একই সঙ্গে আরব দেশগুলোও তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত গোলাবারুদ পুনরায় সরবরাহ করতে ওয়াশিংটনের কাছে অনুরোধ করছে, যা ইরানের হামলার খরচ ও প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিসর এখন অনেক বেশি বিস্তৃত ও তীব্র। এতে বোঝা যায়, তারা প্রথমে ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে অচল করে দিতে চায়।’
রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম
মাহমুদিয়ান মনে করেন, রাশিয়া সরাসরি এই যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম। তার মতে, এর পেছনে কয়েকটি কৌশলগত কারণ রয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে তেলের দাম বাড়বে এবং পূর্ব এশিয়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে—যা রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের জন্য লাভজনক হতে পারে।
এছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আরব দেশগুলোর দিকে সরিয়ে নিতে পারে।
মাহমুদিয়ান আরও বলেন, মস্কো এখনও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অনুকূল কোনো সমঝোতার আশা করতে পারে, তাই তারা ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চাইবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার সঙ্গে ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে সেই সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইসরায়েলে ব্যবহৃত শীর্ষ পাঁচ ভাষার একটি রুশ ভাষা। দেশটির উল্লেখযোগ্য অংশের আশকেনাজি ইহুদিদের শিকড় রাশিয়ায় বা তারা রুশ ভাষায় কথা বলেন। একই সঙ্গে রাশিয়ায় এক লাখের বেশি রুশ-ইসরায়েলি নাগরিক বসবাস করেন।
মাহমুদিয়ান আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ইসরায়েল রাশিয়ার সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি আধুনিকায়নে কিছু সহযোগিতা করেছিল।
আঞ্চলিক সংঘাতেও ইসরায়েল রাশিয়ার ‘রেড লাইন’ অতিক্রম না করার চেষ্টা করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ইসরায়েল ইউক্রেনকে আয়রন ডোম প্রযুক্তি দেয়নি, যদিও তা দেওয়ার সক্ষমতা তাদের ছিল। সিরিয়াতেও ইসরায়েল ইরান ও সিরিয়ার সামরিক অবস্থানে হামলা চালালেও রাশিয়ার স্থাপনাগুলো এড়িয়ে গেছে।




































