
যা গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ।। ছবি: আল জাজিরা
খরচ কমানো ও বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকা শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক হামলা চালাচ্ছেন। এতে দেশটির নেতৃত্ব, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
তার পূর্বসূরিদের মতো ট্রাম্পও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছেন—যা গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং অন্তত ১০টি দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে। এসব অভিযানের মধ্যে ড্রোন হামলা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—কখনও কখনও একই বছরে একাধিকবার।
তবে এসব হিসাবের মধ্যে গোপন বা বিশেষ সামরিক অভিযানের সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই।
কয়েক দশকের যুদ্ধের খরচ
৯/১১ হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। এই বৈশ্বিক সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে এবং বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, আগ্রাসন ও বিমান হামলার সূচনা করে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড পাবলিক এফেয়ার্স-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সরাসরি প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এতে পরোক্ষ মৃত্যু—যেমন খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা বা যুদ্ধজনিত রোগে মৃত্যুর ঘটনা—ধরা হয়নি।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এসব সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৫.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে প্রতিরক্ষা দপ্তরের (ডিওডি) ব্যয় ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার, হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার, ডিওডির মূল বাজেট বৃদ্ধিতে ৮৮৪ বিলিয়ন ডলার, ভেটেরানদের চিকিৎসা ব্যয়ে ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য নেওয়া ঋণের সুদ হিসেবে অতিরিক্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া আগামী ৩০ বছরে ভেটেরানদের সেবায় আরও অন্তত ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ব্যয়ের মোট পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১–২০২১)
৯/১১–এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো।
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু হয়।
প্রাথমিক অভিযানে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান সরকার পতন হয়। তবে পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম সংঘাতে পরিণত হয়। চারজন প্রেসিডেন্টের আমল পেরিয়ে ২০ বছর পর ২০২১ সালে চূড়ান্তভাবে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। এরপর তালেবান আবার আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ক্ষুধা, রোগ ও যুদ্ধজনিত আঘাতে আরও কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের অন্তত ৩,৫৮৬ জন সেনা নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয় আনুমানিক ২.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
ইরাক যুদ্ধ (২০০৩–২০১১)
২০০৩ সালের ২০ মার্চ প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাকে দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু করেন। অভিযোগ ছিল, প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে—যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
২০০৩ সালের ১ মে বুশ ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ ঘোষণা করে বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান সমাপ্তির কথা জানান।
কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা ও ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, যা আইএসআইএল (আইএসআইএস)-এর উত্থানকে ত্বরান্বিত করে।
২০০৮ সালে বুশ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হন এবং প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ২০১১ সালে তা সম্পন্ন হয়।
ড্রোন যুদ্ধ: পাকিস্তান, সোমালিয়া ও ইয়েমেন
আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না হলেও যুক্তরাষ্ট্র বিমান ও ড্রোন অভিযান সম্প্রসারণ করে। ২০০০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিআইএ পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী উপজাতীয় এলাকায় ড্রোন হামলা শুরু করে, যেখানে আল-কায়েদা ও তালেবান নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে পাকিস্তানে ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
একই সময়ে সোমালিয়ায় সন্দেহভাজন আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এবং পরবর্তীতে আল-শাবাবের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনেও আল-কায়েদা নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালিত হয়।
লিবিয়া হস্তক্ষেপ
২০১১ সালে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো-নেতৃত্বাধীন অভিযানে অংশ নেয়। নো-ফ্লাই জোন কার্যকর করতে মার্কিন বাহিনী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন। এরপর লিবিয়া দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও গোষ্ঠীগত সংঘাতে নিমজ্জিত হয়।
ইরাক ও সিরিয়ায় অভিযান
২০১৪ সাল থেকে সিরিয়ার যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইএলকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে হস্তক্ষেপ করে। ইরাকে চলমান অভিযানের ধারাবাহিকতায় সিরিয়ায় ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয় এবং স্থানীয় অংশীদার বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া হয়।
ইরাকে মার্কিন বাহিনী ইরাকি সেনাদের পরামর্শ ও সহায়তা দেয়, আইএসআইএল অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং ইরানি প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা চালায়। এর মধ্যে ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে এক হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হন।
আল জাজিরা অবলম্বনে




































