শনিবার । মার্চ ২১, ২০২৬
ড. ইসলাম শফিক মতামত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ৬:১৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

বিটিভির ৬১তম বর্ষপূর্তি

ঐতিহ‍্যকে ধারণ করে যেতে হবে বহুদূর!


Islam Shafiq

বিটিভি: ঐতিহ‍্যকে ধারণ করে যেতে হবে বহুদূর

আজ ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠার ৬১ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর, দিনটি ছিলো শুক্রবার; এদিন ঢাকার তৎকালীন ডিআইটি ভবনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়।

জামিল চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে অভিহিত করা হয়ে বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পের জনক হিসেবে। ষাটের দশকে জামিল চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রেই একটি জরিপ করার কাজ পেয়েছিলেন বাণিজ্যিকভাবে ঢাকায় একটি টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপিত হলে তা আদৌ লাভজনক হবে কি না, এ বিষয়ে। জরিপ শেষে নিপ্পন ইলেকট্রিক কোম্পানির (এনইসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুজিমার ঢাকায় পরীক্ষামূলক টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপন পরিচালনার জন‍্য জামিল চৌধুরীকে দায়িত্ব দেন। জামিল চৌধুরী এনইসি টেলিভিশন গ্রুপের কেন্দ্রাধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করে ১৯৬৪ সালের পহেলা এপ্রিল ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকায় সিদ্ধেশ্বরীতে অবস্থিত তাঁর বাসায় ক‍্যাম্প অফিস স্থাপন করে এনইসি টেলিভিশনের কাজ শুরু করেন। অল্প কিছুদিনের মাঝেই অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে যোগ দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কলিম শরাফী। পর্যায়ক্রমে এই পাইলট প্রজেক্টে যুক্ত হন— খালেদ সালাহউদ্দিন, এম. মনিরুল আলম, সৈয়দ ইবনে ইমাম, হেনেসি ফ্রান্সিস, এ কে এম ফজলুল হক, জামান আলী খান, মোহাম্মদ আকমল খান ও শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার প্রমূখ।

স্টুডিও নির্মাণ ও ব্রডকাস্টিং অ্যানটেনা স্থাপনের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি উঁচু ভবনের, যা তেজগাঁও বিমানবন্দরের ফ্লাইয়িং এরিয়া থেকে অত‍্যাবশ‍্যকীয়ভাবে দূরে অবস্থিত হতে হবে। সেসময়ে ডিআইটি ভবন ছিল ঢাকার সবচেয়ে উঁচু ভবন এবং তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বেশ দূরে। সবদিক বিবেচনা করে এই ভবনটিকে নির্ধারণ করা হয় টিভি সেন্টারের জন‍্য। ভবনের ছাদে স্থাপন করা হয় অ্যানটেনা আর নিচতলায় করা হয় স্টুডিও। স্টুডিও নির্মাণ, লাইট গ্রিড, অডিও ব‍্যবস্থাপনা, ক‍্যামেরা চালনার পরিবেশ, সম্প্রচার যন্ত্রপাতি সেটআপ সম্পন্ন করে চূড়ান্ত করা হয় উদ্বোধনী তারিখ। পাইলট টেলিভিশন ঢাকা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর, ১০ পৌষ ১৩৭১, শুক্রবার সন্ধ্যা ছটায়। ডিআইটি ভবনের নিচে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। অতিথি ছিলেন— তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, গভর্নর মোনেম খান, এনইসির প্রেসিডেন্ট ওয়াতানাবে, কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের সচিব আলতাফ গওহর। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন মরডেকা কোহেন।

উদ্বোধন পরবর্তী সময়ো ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রের ৯০ দিন পরীক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মেয়াদ শেষ হয় ১৯৬৫ সালের ২৫ মার্চে। পরীক্ষা পর্ব সফল হওয়ায় সরকার ৫ কোটি টাকার মূলধন বরাদ্দ করে। ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনের অধীনে ‘টেলিভিশন প্রোমোটার্স কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। তখন থেকে কেন্দ্রপরিচিতি প্রতীক ‘পাইলট টেলিভিশন ঢাকা’ থেকে পরিবর্তন করে ‘পাকিস্তান টেলিভিশন সার্ভিস, ঢাকা’ করা হয়েছিল।

একাত্তরের উত্তপ্ত দিনগুলোতে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানেও পরিবর্তন আসে। ডিআইটি ভবনের স্টুডিও থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানে দেশের সার্বিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। ৩ মার্চ থেকে কেন্দ্রপরিচিতি প্রতীক ‘পাকিস্তান টেলিভিশন সার্ভিস, ঢাকা’ বদলে রাখা হয় ‘ঢাকা টেলিভিশন’। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে। নাম রাখা হয় ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন করপোরেশন ঢাকা’। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ গানের স্বরলিপির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য তৈরি করা হয় সিগনেচার টিউন। ১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে রাষ্ট্রপতির ১১৫ নম্বর আদেশবলে বাংলাদেশে অবস্থিত সাবেক পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশে কর্মরত টেলিভিশন করপোরেশনের সব কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তারূপে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে টেলিভিশনের কেন্দ্রপরিচিতি প্রতীক করা হয় ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা’। যা বাংলাদেশ টেলিভিশন বা সংক্ষেপে ‘বিটিভি’ নামে পরিচিত। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে বিটিভি। ১৯৭৫ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি বিটিভি ডিআইটি ভবন থেকে রামপুরায় নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮০ সালের ১ ডিসেম্বর রঙিন সম্প্রচার শুরু করে ইতিহাস তৈরি করে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সম্ভাবনা বহুমাত্রিক এবং কৌশলগতভাবে এই গণমাধ‍্যম অতীব গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হিসেবে বিটিভি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি জাতীয় পরিচয় নির্মাণ, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। বেসরকারি স‍্যাটেলাইট চ্যানেল যেখানে বিজ্ঞাপননির্ভর কনটেন্টে সীমাবদ্ধ, সেখানে বিটিভি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা পালন করতে সক্ষম। শিক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিটিভির ভূমিকা অপরিসীম। বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন, নীতিনির্ভর টকশো, নীতিনির্ধারণমূলক আলোচনা এবং নাগরিক মতামতভিত্তিক অনুষ্ঠান রাষ্ট্র ও জনগণের সাথে যোগাযোগ সম্পর্কের মাধ‍্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদারে বিটিভির সম্ভাবনা বহুমাত্রিক। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তর বিটিভির সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। অনডিমান্ড কনটেন্ট, আর্কাইভভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাণ এবং সমকালীন নিউ-মিডিয়ার পরিপ্রক্ষিতে তরুণ প্রজন্ম উপযোগী কনটেন্ট পরিকল্পনা ও সম্প্রচার করলে বিটিভি নতুন প্রজন্মের দর্শককেও পর্দামূখী করতে পারবে। পেশাদার জনবল, সৃজনশীল কনটেন্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক প্রযোজনা কৌশল নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ টেলিভিশন অতীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে ভবিষ্যতের প্রাসঙ্গিক, বিশ্বাসযোগ্য ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হিসেবে স্বীয় অবস্থানকে আলোকিত করতে পারবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৬১তম বর্ষপূর্তিতে প্রত‍্যাশা— ঐতিহ‍্যকে ধারণ করে যেতে হবে বহুদূর!

ড. ইসলাম শফিক: শিক্ষক, গবেষক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব।