
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। প্রায় ৩ হাজার ৬শ ১৪ দিন পর তারেক রহমান, যিনি তারেক জিয়া নামেই বেশি পরিচিত, ফিরে এসেছেন তাঁর মাতৃভূমিতে। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়ার পর দীর্ঘ ১৭ বছর কেটেছে নির্বাসনের মতো এক বাস্তবতায়। এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়; এটি মানুষের আশা, ক্ষোভ, অপেক্ষা আর গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষার এক সম্মিলিত প্রকাশ।
এই ১৭ বছর বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সহজ ছিল না। রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রতিহিংসা, মামলা-জেল-জুলুম, ক্ষমতার একচেটিয়া চর্চা—সব মিলিয়ে নাগরিক অধিকার বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই সময়টায় তারেক রহমান ছিলেন লন্ডনে। কিন্তু দূরত্ব তাঁকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং প্রবাসে থেকেও তিনি দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নীতিগত অবস্থান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বার্তা নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে গেছেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে, বক্তব্যে-লেখায়, নীতিগত ঘোষণায় তিনি দেশে থাকা নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
তারেক রহমানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তিনটি বিষয়—নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ যে ভোটাধিকার সংকট, বিচারহীনতা, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক দলীয়করণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার বিপরীতে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি ক্রমশ জোরালো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক জিয়ার প্রত্যাবর্তন মানুষের মনে নতুন করে প্রত্যাশা জাগিয়েছে—এই প্রত্যাশা যে রাজনীতি আবার মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হবে, ক্ষমতা আবার জবাবদিহির মধ্যে আসবে।
ঢাকায় তাঁর আগমন ঘিরে যে জনসমুদ্র দেখা গেছে, তা কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। লাখ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়—বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো জনমানুষের ভেতরেই বাস করে, কেবল তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পথনির্দেশনার প্রয়োজন ছিল। মানুষ এমন একজন নেতৃত্ব দেখতে চায়, যিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলেন।
তারেক জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় কেবল একটি দলের উত্তরাধিকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক ভাষা ও এজেন্ডা তৈরি করেছেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা—এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য বরাবরই স্পষ্ট। তিনি বারবার বলেছেন, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই গণতন্ত্রের ভিত্তি। এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ক্ষমতার চর্চা রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে হলো, যখন দেশের তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তারা পরিবর্তন চায়, অন্যদিকে রাজনীতির প্রতি অনাস্থা তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখে। তারেক জিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রজন্মকে আশ্বস্ত করা—রাজনীতি মানেই কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি নীতি, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়া। যদি তিনি তরুণদের ভাষায়, তাদের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে রাজনৈতিক রোডম্যাপ তুলে ধরতে পারেন, তাহলে এই প্রত্যাবর্তন একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
সমালোচকেরা অবশ্য প্রশ্ন তুলবেন। অতীতের রাজনীতি, দলীয় ভুল, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা—এসব প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, প্রশ্নের জবাব দিতে হয় জনতার সামনে দাঁড়িয়ে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা সেই সুযোগ তৈরি করেছে। এখন তিনি আর দূর থেকে নন, সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এই সরাসরিতাই গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত।
এই প্রত্যাবর্তন ক্ষমতার সমীকরণেও প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক একচেটিয়াত্ব গড়ে উঠেছে, তার বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। শক্তিশালী বিরোধী মানে অস্থিরতা নয়; বরং নীতি, যুক্তি ও জনসমর্থনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে রাখতে সহায়ক একটি শক্তি। তারেক জিয়ার নেতৃত্বে যদি সেই ভূমিকা কার্যকরভাবে পালিত হয়, তাহলে লাভবান হবে রাষ্ট্রই।
সবশেষে বলা যায়, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ কোনো সমাপ্তি নয়, এটি একটি সূচনা। তারেক জিয়ার বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন গণতন্ত্রের সূর্যোদয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু সেই সূর্যোদয়ের প্রত্যাশাকে আবার দৃশ্যমান করেছে। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের—এই প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত না করে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দেওয়া। ইতিহাস অপেক্ষা করছে, জনসমুদ্র তাকিয়ে আছে। গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে হলে সাহস, সংযম এবং দূরদৃষ্টি—এই তিনের সমন্বয়ই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা








































