বুধবার । মার্চ ৪, ২০২৬
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু মতামত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

গণতন্ত্রের পক্ষে এক আপোষহীন নাম বেগম খালেদা জিয়া


Begum Khaleda Zia

ফাইল ছবি

কিছু মানুষের জীবন শুধু একটি সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে না, তারা হয়ে ওঠেন সময়েরই প্রতিচ্ছবি। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নিয়ে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ আট দশকের যাত্রায় তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে। তাঁর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি ঘটল, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর উপস্থিতি আরও গভীর হয়ে রয়ে গেল।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কোনো প্রস্তুত মঞ্চে শুরু হয়নি। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন নিয়তির কঠিন ডাকেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে নয়, বরং তাঁর মৃত্যুর পর এক শূন্যতার ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি দলের আশ্রয়, একটি জাতির ভরসা। ব্যক্তিগত শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার এই ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করেছিল।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যতিক্রম। সেনা শাসনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি আপোষহীন ছিলেন। ক্ষমতার জন্য নয়, বরং ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক শাসনের প্রশ্নে তিনি বারবার রাজপথে দাঁড়িয়েছেন। কারাবরণ, অবরুদ্ধতা, অসুস্থতা—কিছুই তাঁকে নত করতে পারেনি। কারণ তাঁর রাজনীতি ছিল বিশ্বাসের, সুবিধার নয়।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখিয়েছেন দৃঢ়তা ও সংযম। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অর্জন। সেই সময় তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সংসদকে শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরানো—এসব ছিল তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।

তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, খাদ্য উৎপাদন, নারী ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। বিশেষ করে নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণে তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। নিজে নারী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন নেতৃত্ব লিঙ্গনির্ভর নয়, মনন ও সাহসের বিষয়।

তবে তাঁর জীবন কেবল সাফল্যের গল্প ছিল না। এটি ছিল অবিরাম লড়াইয়ের ইতিহাস। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিনি বন্দিত্ব, চিকিৎসা-বঞ্চনা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে গেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, এত কিছুর পরও তিনি প্রতিহিংসার ভাষায় কথা বলেননি। তাঁর নীরবতা অনেক সময় ছিল তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।

একজন রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে নয়, একজন মমতাময়ী জননী হিসেবেও তিনি ছিলেন আলাদা। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মা’। বিপদে-আপদে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেওয়া, নিঃশব্দে সহায়তা করা—এই মানবিক দিকটি তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের আরও কাছে নিয়ে গেছে। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি সাধারণত্ব হারাননি।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র যখনই সংকটে পড়েছে, তখনই বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হয়েছে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে। তিনি জানতেন, গণতন্ত্র কখনো স্থায়ীভাবে অর্জিত হয় না; প্রতিদিন তাকে রক্ষা করতে হয়। সেই উপলব্ধিই তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে, শরীর ভেঙে পড়লেও মন ভাঙেনি।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি একটি সময়ের বিদায়। যে সময় সাহসী কণ্ঠে কথা বলা যেত, যে সময় রাজনীতি ছিল আদর্শের প্রশ্ন—সেই সময় আজ আরও দূরের মনে হয়। কিন্তু ইতিহাস জানে, কিছু মানুষ প্রস্থানের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন।

আজ বাংলাদেশের মানুষ যখন তাঁর দিকে ফিরে তাকায়, তখন তাঁকে কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং একটি সংগ্রামের নাম হিসেবে দেখে। তিনি হয়ে উঠেছেন মহাকালের মহাকাব্য—যার প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয়েছে ত্যাগ, ধৈর্য ও অটল বিশ্বাস দিয়ে।

সময় এগিয়ে যাবে, রাজনীতির ভাষা বদলাবে, কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষে আপোষহীন সেই মমতাময়ী জননীর নাম ইতিহাসের গভীরে স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ এখনো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে—আমরা কি গণতন্ত্রকে আগলে রাখতে পারছি?

এই প্রশ্নই তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]