বুধবার । জুন ৩, ২০২৬
রিয়াজুল হক মতামত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১:০৬ অপরাহ্ন
শেয়ার

কর্মফল, যে ফল অবধারিত


Riazul haq

রিয়াজুল হক ।। মতামত ।। বাংলা টেলিগ্রাফ

মানুষের চরিত্রের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষ প্রায়ই ভাবে, তার বুদ্ধি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। অন্যকে ফাঁদে ফেলতে, হেয় করতে, পিছন থেকে আঘাত করার জন্য, সে নিজের বুদ্ধির প্রদর্শনী ঘটাতে চায়। বর্তমান সমাজে এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। কেউ কারও অগ্রগতি দেখতে পারে না। অন্যের ব্যর্থতায় যে আনন্দ, তা যেন নিজের সফলতার চেয়েও মধুর।

আপনি যখন কাউকে হেয় করেন, তার সুযোগ কেড়ে নেন, বা তাকে সমস্যায় ফেলতে চেষ্টায় থাকেন, তখন আসলে আপনি নিজের ভেতরকার অন্ধকারকেই বাড়াচ্ছেন। এই অন্ধকার একসময় আপনার চিন্তা, মনোভাব আর কাজের মধ্যে ঢুকে যায়। আপনি ক্রমে হীনমন্য, সন্দেহপ্রবণ ও আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠেন। যেমন, একজন কর্মচারী ভাবলো, সহকর্মীর সুনাম নষ্ট করে নিজে এগিয়ে যাবে। সে নিন্দা করল, গুজব ছড়াল। প্রথমে মনে হলো সফল হয়েছে, কিন্তু সময়ের সাথে অফিসে কিংবা অফিসের বাইরে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। কারণ সবাই বোঝে, যে অন্যের ক্ষতি করতে পারে, সে কারও শুভাকাঙ্ক্ষী নয়।

জীবনের এক অদ্ভুত নিয়ম হলো, যা আমরা ছুঁড়ে দিই, তা ঘুরে আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসে। আপনি যদি কারও ভালো চান, কোনো না কোনোভাবে সেই শুভকামনা আপনার কাছেই ফিরে আসে। আর আপনি যদি কৌশলে কারও ক্ষতি করেন, সেই নেতিবাচক শক্তি একসময় আপনাকেই আঘাত করে। এ কারণেই প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘যে অন্যকে কষ্ট দেয়, সে নিজের শান্তি নষ্ট করে।’ কর্মফল হয়তো সাথে সাথে দেখা যায় না, কিন্তু তা অবধারিত।

আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যেখানে প্রতিযোগিতা মানে অন্যকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া। স্কুল থেকে শুরু করে চাকরি, সবাই ‘আমি কীভাবে অন্যকে হারাব’ ভাবতে শিখছে। অথচ মানবসভ্যতার অগ্রগতি এসেছে সহযোগিতার মাধ্যমে, প্রতারণার মাধ্যমে নয়। অন্যকে নিচে নামাতে গিয়ে আমরা যে মানসিক দূষণ ছড়াচ্ছি, তা সমাজকেই দুর্বল করছে।

ইতিহাসে দেখুন। যারা অন্যকে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত তারাই ফেঁসে গেছে। মীর জাফর ভেবেছিল ষড়যন্ত্র করে লাভবান হবে। কিন্তু লাভ হয়নি বরং সে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে লাঞ্চিত হচ্ছে। সে এতটাই ঘৃণিত যে, এখন কারো নাম মীর জাফর দেখাও যায় না।

একজন কর্মকর্তা ভাবতে পারেন, ‘আমি আজ ক্ষমতাবান, তাই যে কোন যোগ্য ব্যক্তিকে অপদস্থ করতে পারি, খারাপ পদায়ন করতে পারি।’ কিন্তু সময় বদলালে, যখন সেই ক্ষমতা থাকে না, তখন তার চারপাশের লোকই তাকে একা করে চলে যায়। আর ‘সময়’ এমন এক অবিচল বিচারক, সব কিছুর হিসাব রাখে।

অন্যকে নিচে নামানো নয়, বরং তাকে উঠতে সাহায্য করুন, এটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। কারণ অন্যের সফলতা আপনার ক্ষতি নয়, বরং আপনার সমাজ, আপনার পরিসরকে আরও শক্তিশালী করে। যদি আপনি কারও জন্য সুযোগ তৈরি করেন, একদিন কেউ না কেউ আপনার জন্যও পথ তৈরি করবে। মানুষের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা যেন বীজের মতো, আপনি যা বপন করেন, ঠিক তাই-ই ফসল হিসেবে ফিরে আসে।

আপনি যতই চাতুর্য দেখান না কেন, অন্যকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে আপনি নিজের ভবিষ্যৎকেই ফাঁদে ফেলছেন। মানুষের প্রকৃতি ও সময়ের নিয়ম এমন যে, অন্যের অন্ধকারের পথ খুঁড়ে আপনি নিজের আলোর পথ বন্ধ করছেন।

সুতরাং এবার দয়া করে থামুন। অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়ার আগে একবার ভাবুন, অন্যদের জন্য যত্ন করে আপনি যে গর্ত খুঁড়ছেন, সেখানে সামনের দিনে আপনারই অবস্থান হবে।

রিয়াজুল হক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]