রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
সেতু ইসরাত জাতীয় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ন
শেয়ার

ভোটের মাঠে পরিবর্তনের হাওয়া, আলোচনায় যেসব নারী প্রার্থী


Women-Candidatess.jpg

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দেবেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটার। ৩০০ আসনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজারের অধিক হলেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লড়াকু নারী প্রার্থীরা। যদিও সংখ্যার বিচারে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি (৮১-৮৫জন) কিন্তু গুণগত মানে এবং জনপ্রিয়তায় তারা এবারের নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন।

দীর্ঘদিন পর রাজনীতিতে ফেরা অভিজ্ঞ রাজনীতিক থেকে শুরু করে জুলাই বিপ্লবোত্তর নতুন প্রজন্মের তরুণ নেতৃত্ব – উভয় ধারার নারী প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। মাঠের লড়াইয়ে পেশিশক্তি আর পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এই নারীরা পরিবর্তনের এক নতুন মানচিত্র তৈরি করছেন। এবারের নির্বাচনে বিশেষ নজর কেড়েছেন এমন কয়েকজন আলোচিত নারী প্রার্থীর নির্বাচনী লড়াই ও সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের এই বিশেষ আয়োজন।

তাসনিম জারা (ফুটবল)
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের সামনের কাতারে থাকা তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে তার প্রতীক ফুটবল।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আসা এই নারী খিলগাঁও, মুগদা, সবুজবাগ ও মান্ডা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা–৯ আসনের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। 

jaraদিলশানা পারুল (শাপলা কলি)
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনয়ন পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী দিলশানা পারুল। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনে তিনি ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে লড়বেন। 

দিলশানা পারুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা পারুল বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় চাকরিরত। পাশাপাশি তিনি কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। তিনি নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই এনসিপির পথচলা। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যেই আমি আমার শিকড়ে ফিরে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। 

শামা ওবায়েদ (ধানের শিষ)
ফরিদপুরের ৪টি আসনের মধ্যে ২টি আসনের বিএনপির নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের একজন বিএনপির সাবেক মহাসচিব কেএম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ধানের শীষের প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পিতার উত্তরসূরি হিসেবে এলাকায় তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। নানা সময়ে টিভি টক শো এবং বিভিন্ন জায়গায় সাহসী বক্তব্য দিয়ে জনপ্রিয় এবং বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। শামা ওবায়েদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে জামায়াত সমর্থিত খেলাফত মজলিশের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মো. আকরাম আলীর। 

shamaসানজিদা ইসলাম তুলি (ধানের শিষ)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামকে (তুলি) প্রার্থী করছে বিএনপি।  গুম নিয়ে সোচ্চার ভূমিকায় দেশ-বিদেশে তিনি বেশ প্রশংসিত হন। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে চাই। ওই পরিবর্তনটা হচ্ছে প্রতিহিংসার বাইরের রাজনীতি। অপরাজনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য হত্যাযজ্ঞ চালানো—এ রকম রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে আমরা বাংলাদেশকে দেখতে চাই।

প্রকৌশলী শম্পা বসু (মই)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী  হচ্ছেন বুয়েটের সাবেক ছাত্রনেতা ও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সভাপতি বাসদ কেন্দ্রীয় সংসদ কমিটির সদস্য ও মাগুরা জেলা আহবায়ক ইঞ্জিনিয়ার শম্পা বসু। মাগুরা সদরের চাউলিয়া ইউনিয়নের গোয়ালখালী, করচা ডাঙ্গা, বালিয়াডাঙ্গা ও শ্রীপুরের কাদিরপাড়া, নাকোল, সব্দালপুর, রাধানগর, শ্রীকোল এলাকার মাঠ পর্যায়ে ভোটারদের প্রচুর সাড়া পাচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মই মার্কা নিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 

shampa

ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল (ধানের শিষ)
দীর্ঘদিন ধরে আইন, শিক্ষা ও কর্পোরেট খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা, ক্যাপিটাল ল কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি, গ্রীন ডেল্টা লাইফ ইন্সুরেন্স লিমিটেড এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)-এর স্বাধীন পরিচালক পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারনে।  তিনি নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। 

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (হাঁস)
বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের দুই ইউনিয়ন) আসনে হাঁস মার্কায় নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। চাঁদাবাজি, মামলাবাজি, ব্যবসা দখল, জমি দখল, অবৈধ বালুর ব্যবসা, মাটির ব্যবসা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালান রুমিন ফারহানা। 

rumin farhanaইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো (ধানের শিষ)
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২৩৭ আসনে নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরমধ্যে বরিশাল বিভাগে (ঝালকাঠি ও নলছিটি-২) একমাত্র নারী প্রার্থী হলেন ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। নদী ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে চান। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। 

শেখ হাবিবা (ফুটবল)
রাজশাহী জেলার একমাত্র নারী প্রার্থী, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোছা. হাবিবা বেগম ওরফে শেখ হাবিবা ফুটবল প্রতীক নিয়ে লড়ছেনআওয়ামী লীগ সরকারের সময় হাবিবা বেগমের নামে ছয়টি মামলা হয়। তাঁকে সাতবার কারাগারে যেতে হয়েছে। তিনি পুলিশের হাতে কামড় দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন। এখনো তাঁর নামে দুটি মামলা আছে। হাবিবা উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক নারীবিষয়ক সম্পাদক। তিনি এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর তাঁকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়। 

habibaচিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী (মই)
বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে যে দুজন নারী প্রার্থী রয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম ডা. মনীষা চক্রবর্তী। ভোটারদের মধ্যে দরিদ্র শ্রেণির বিপুল একটি অংশ রয়েছেন তার সঙ্গে। কোটিপতি প্রার্থীদের সঙ্গে তিনি লড়ছেন তার অনুসারীদের মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে। রাজনীতিতে কতো দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় তার উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। 

বরিশাল-৫ আসনে মই প্রতীকের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত মুখ। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) এই নারী নেত্রী তার সাহসী ও প্রতিবাদী অবস্থানের কারণে সাধারণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছেন।

সীমা দত্ত (কাঁচি)
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) ঢাকা–৭ আসনে কাঁচি মার্কার প্রার্থী সীমা দত্ত।টাকা–নির্ভর রাজনীতির বিপরীতে তিনি জোর দিতে চান আইন, ন্যূনতম মজুরি ও শ্রমিক মর্যাদার ওপর। নারী ভোটার ও নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়ে সীমা দত্ত তুলে ধরতে চান আদর্শবাদী রাজনীতির বিকল্প ভাষা। বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও নিপীড়িত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অধিকার নিয়ে লড়াই করছেন। 

shima

সংখ্যার লড়াইয়ে কার পাল্লা ভারী?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাঠের লড়াইয়ে সাংগঠনিক শক্তির বিচারে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ধানের শীষ প্রতীকের ২৯১ জন প্রার্থী। তবে হাতপাখা প্রতীকে ২৫৮ জন প্রার্থী দিয়ে চমক দেখিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামী (২২৯ জন) এবং জাতীয় পার্টিও (১৯৮ জন)। এর বাইরে জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির ৩২ জন প্রার্থীর অংশগ্রহণ নির্বাচনের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, দলীয় প্রতীকের এই বিশাল বহরের পাশাপাশি স্বতন্ত্র হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে লড়া ৭৬ জন প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও অনেক ক্ষেত্রে জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে ভোটাররা কার গলায় জয়ের মালা পরান, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।