বুধবার । মার্চ ৪, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন
শেয়ার

চাঁদে লেজার পাঠিয়ে মিললো ৩৮ অজানা প্রশ্নের উত্তর


laser

পৃথিবীতে বসে চাঁদের দূরত্ব মাপার এই পদ্ধতিকে বলা হয় লুনার লেজার রেঞ্জিং

চাঁদনী রাতে আকাশের দিকে তাকালে চাঁদকে যতটা কাছে মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার কিলোমিটার। এই বিশাল দূরত্ব সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা বিজ্ঞানের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি সেই চ্যালেঞ্জ জয় করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে চীন। দক্ষিণ চীনের কুয়াংতোং প্রদেশের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘থিয়ানচিন লেজার রেঞ্জিং স্টেশন’-এর বিজ্ঞানীরা চাঁদে স্থাপিত নেক্সট-জেনারেশন লুনার রেট্রোরিফ্লেক্টর (NGLR-1) থেকে সফলভাবে লেজার প্রতিধ্বনি সংকেত শনাক্ত করেছেন। শুধু সংকেত শনাক্তই নয়, তাঁরা পৃথিবীর সাথে চাঁদের ৩৮টি পৃথক দূরত্ব সফলভাবে পরিমাপ করেছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানির পর চতুর্থ দেশ হিসেবে এই জটিল প্রযুক্তিতে নাম লিখিয়েছে চীন।

পৃথিবীতে বসে চাঁদের দূরত্ব মাপার এই পদ্ধতিকে বলা হয় লুনার লেজার রেঞ্জিং (LLR)। পদ্ধতিটি শুনতে সহজ মনে হলেও এর গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। ভূপৃষ্ঠের একটি পর্যবেক্ষণাগার থেকে চাঁদের পৃষ্ঠে স্থাপিত একটি বিশেষ প্রতিফলকের দিকে লেজার পালস পাঠানো হয়। সেই রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে যে সময় নেয়, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গণনা করে পৃথিবী থেকে চাঁদের সঠিক দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়। থিয়ানচিন লেজার রেঞ্জিং ষ্টেশনের অধ্যাপক লিন সুও তং বলেন, “এই লেজার পালসের আসা-যাওয়ার সময় নির্ভুলভাবে পরিমাপ করেই আমরা দুই মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যকার দূরত্ব নির্ধারণ করতে পারি।”

২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে এই অত্যাধুনিক NGLR-1 রেট্রোরিফ্লেক্টরটি স্থাপন করে। বিশ শতকের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মিলে চাঁদে পাঁচটি লেজার রিফ্লেক্টর বসিয়েছিল, যা আজও বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করছেন। তবে নতুন এই NGLR-1 হলো সেই পুরনো প্রযুক্তিরই একটি আধুনিক সংস্করণ বা ‘আপডেট ভার্সন’, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সূক্ষ্ম তথ্য সংগ্রহে কার্যকর। চীনা বিজ্ঞানীরা মার্কিন এই প্রযুক্তি থেকে সংকেত গ্রহণ করে যে হিসেবনিকেশের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, তা মূলত তাঁদের উচ্চাভিলাষী ‘থিয়ানচিন’ প্রকল্পেরই একটি অংশ।

২০১৪ সালে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রায় ১ লক্ষ কিলোমিটার উচ্চতায় তিনটি উপগ্রহ স্থাপন করা। এই উপগ্রহগুলো মহাকাশে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কিলোমিটার বাহুবিশিষ্ট একটি বিশাল সমবাহু ত্রিভুজাকার নক্ষত্রপুঞ্জ তৈরি করবে। এই বিশাল কাঠামোটি একটি মহাকাশ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণাগারে পরিণত হবে, যা মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান ও মহাবিশ্ববিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। পৃথিবী থেকে চাঁদের এই সুনির্দিষ্ট দূরত্ব পরিমাপ করা কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, বরং এটি মহাকাশবিজ্ঞানের গভীর রহস্য উন্মোচনের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

থিয়ানচিন লেজার রেঞ্জিং ষ্টেশনের অধ্যাপক লিন সুও তং বলেন, ‘এই তথ্যগুলো আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের নির্ভুলতা যাচাই করতে এবং মহাকর্ষ তত্ত্ব পরীক্ষায় সাহায্য করবে। এছাড়া, এর মাধ্যমে পৃথিবী-চাঁদ সিস্টেমের বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। যেমন—চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে, যা কেবল এই সূক্ষ্ম পরিমাপের মাধ্যমেই জানা সম্ভব। সর্বোপরি, চাঁদের কম্পন ও ঘূর্ণনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এর অভ্যন্তরীণ গঠন ও কোর সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণা পাওয়া যায়।’

এই সাফল্য কেবল একটি পরিমাপের গল্প নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার অজানাকে জানার এক নিরন্তর অভিযাত্রা। পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূরে চাঁদের ধূসর পৃষ্ঠে বসানো ক্ষুদ্র এক আয়না থেকে ফিরে আসা আলোকবিন্দুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের গভীর রহস্যের সূত্র।

তথ্যসূত্র: সিএমজি