মঙ্গলবার । মার্চ ১০, ২০২৬
মাহবুব কিংশুক আন্তর্জাতিক ১০ মার্চ ২০২৬, ৩:৩৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এক্সে বেড়েছে মুসলিমবিরোধী পোস্ট, গবেষণায় উদ্বেগ


x

যেখানে দৈনিক এমন পোস্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজারের কম, যুদ্ধ শুরুর পর তা বেড়ে ৬ হাজারেরও বেশি হয়ে যায়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) মুসলিমবিরোধী পোস্টের সংখ্যা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইট জানিয়েছে, তারা ১ জানুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত এক্সে এমন সব পোস্ট পর্যবেক্ষণ করেছে যেগুলোতে মুসলিমদের অমানবিকভাবে উপস্থাপন করা, সমাজ থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান বা সহিংসতায় উসকানি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিনই মুসলিমবিরোধী পোস্টের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। ওই দিন আগে যেখানে দৈনিক এমন পোস্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজারের কম, যুদ্ধ শুরুর পর তা বেড়ে ৬ হাজারেরও বেশি হয়ে যায়।

গবেষণাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে করা পোস্টগুলোর ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলিমদের লক্ষ্য করে লেখা হয়েছিল।

গবেষকদের মতে, এসব পোস্টের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সেগুলোর দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। বিশেষ করে ‘রিপোস্ট’-এর মাধ্যমে ক্ষতিকর বা বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন বলছে, রিপোস্টসহ মোট ইসলামবিদ্বেষী কনটেন্টের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪১৭। অর্থাৎ মূল পোস্টগুলোর তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি ছড়িয়ে পড়েছে এসব ঘৃণামূলক বার্তা।

যদিও ৫ মার্চের পর থেকে এমন পোস্টের সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে, তবুও গবেষণাটি সতর্ক করে বলেছে—এই উত্থানের পেছনের মূল পরিস্থিতি এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, অনেক পোস্টে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিমালা নেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে তথাকথিত “মুসলিম এক্সক্লুশন অ্যাক্ট” চালুর আহ্বান বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সব মুসলিমকে বহিষ্কারের মতো চরম প্রস্তাবও ছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে কিছু কঠোরপন্থী রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ ও ডানপন্থী ভাষ্যকার বিভিন্ন সময় মুসলিমদের লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছেন।

সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, অনেক পোস্টে মুসলিমদের “ইঁদুর”, “পোকা-মাকড়”, “পরজীবী” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ইতিহাসে দেখা গেছে—এ ধরনের ভাষা অনেক সময় লক্ষ্যবস্তু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতার পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া কিছু পোস্টে মুসলিমদের একটি “সংক্রমণ” বা “মহামারি” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা নাকি আমেরিকার শহর ও প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকি—এমন দাবি করে তাদের নির্মূল করার আহ্বানও দেখা গেছে।

প্রতিবেদন আরও বলেছে, কিছু পোস্টে সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে, যেগুলোকে “আত্মরক্ষা” বা “সভ্যতা রক্ষার লড়াই” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইট এক্স কর্তৃপক্ষকে সহিংস বক্তব্য ও ঘৃণামূলক আচরণের অভিযোগে ৩০টি পোস্টের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয়। এর মধ্যে মাত্র ১১টি পোস্ট সরানো হয়েছে, আর বাকি ১৯টি ৯ মার্চ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মে রয়ে গেছে।

সংগঠনটির মতে, এক্সে নীতিমালা থাকলেও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, যার কারণে মুসলিমরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর জন্য বিশেষ “ট্রাস্টেড ফ্ল্যাগার” মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করেছে CSOH, যাতে তারা দ্রুত ঘৃণামূলক বা সহিংস কনটেন্ট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে পারে।

একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কমিউনিটি নেতাদেরও অনলাইন বিদ্বেষ পর্যবেক্ষণ জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে এসব বক্তব্য বাস্তব জীবনে সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই তা মোকাবিলা করা যায়।

মিডল ইস্ট আই