রবিবার । মে ৩, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১ মে ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার

ভারতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ লাখো মানুষ, নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বেগ


India

পশ্চিমবঙ্গেই ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ মৃত ব্যক্তির নাম হলেও, বাকি প্রায় ৬৭ লাখ নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

ভারতে ভোটার তালিকা থেকে লাখো মানুষের নাম বাদ পড়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ। কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বহু মানুষ হঠাৎ করেই জানতে পেরেছেন, তাদের ভোটাধিকার আর নেই।

৬২ বছর বয়সী সাদরে আলম, যিনি ভারতের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এপ্রিল মাসের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি জানতে পারেন, তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নিজের বাড়িতে বসে তিনি একটি মোটা ফাইল দেখান—যেখানে রয়েছে প্রায় ৩০টি নথি। তার দাদার ১৯২০-এর দশকের জমির কাগজ, বাবা-মায়ের পুরোনো ভোটদানের প্রমাণ, এমনকি তার সেনাবাহিনীর ছাড়পত্র। কিন্তু এসব দেখিয়েও তিনি ভোটার তালিকায় নাম ফেরাতে পারেননি।

সিএনএন-এর প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, এই দেশটা আর আমার নেই। সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করছে—আমি সেনাবাহিনীতে থেকেও কীভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়লাম?’

শুধু আলমই নন, পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ নাগরিক সুপ্রবুদ্ধ সেন (৮৮) এবং তার স্ত্রীও হঠাৎ করেই ভোটাধিকার হারান। তাদের ক্ষেত্রেও কোনো কারণ জানানো হয়নি। এটি তাদের জন্য আরও বেদনাদায়ক, কারণ সুপ্রবুদ্ধ সেনের দাদা ভারতের সংবিধানের প্রথম সংস্করণের অলংকরণে কাজ করেছিলেন।

সেন জানান, তিনি নিজের শিক্ষাগত সনদ, পেনশনের কাগজপত্র, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট পর্যন্ত জমা দিয়েছেন। তবুও কোনো সমাধান পাননি। তিনি বলেন, ‘এরপর আর কী দেখাব বুঝতে পারছি না।’

একটি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গেই ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ মৃত ব্যক্তির নাম হলেও, বাকি প্রায় ৬৭ লাখ নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনের আগে আরও বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা জরুরি—ডুপ্লিকেট নাম, মৃত ব্যক্তির নাম এবং অন্যান্য অসঙ্গতি দূর করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম। গবেষণা বলছে, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশই মুসলিম, যেখানে রাজ্যে তাদের মোট জনসংখ্যা ২৭ শতাংশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে। তারা মনে করছেন এটি শুধু ভোটাধিকার নয়—নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।

রাজনৈতিক বিতর্ক
ভারতের বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, নির্বাচন কমিশন সরকারের হয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করছে না।

গত ডিসেম্বর এক বক্তব্যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীরা দেশের প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের ‘সনাক্ত, বাদ এবং বহিষ্কার’ করা হবে। তার ওই বক্তব্যের পর থেকেই আশঙ্কা বেড়েছে যে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া অনেকেই ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব নিয়েও সমস্যায় পড়তে পারেন।

বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা মুর্শিদাবাদের একটি গ্রামে ৮০০ ভোটারের মধ্যে ২৪৩ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা নূরফা বিবি বলেন, ‘মানুষ বলছে, আমাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে। তাই আমরা ভয় পাচ্ছি।’

সুপ্রবুদ্ধ সেন ও তার স্ত্রীর নাম শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার পর পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে এখনও লাখো মানুষ অনিশ্চয়তায় রয়েছেন—তাদের ভোটাধিকার বা নাগরিকত্ব ভবিষ্যতে নিরাপদ থাকবে কি না, তা নিয়ে।

সুপ্রবুদ্ধ সেন বলেন, ‘আমাদের যোগাযোগ আছে, নথি আছে—তাই আমরা কিছু করতে পেরেছি। কিন্তু যাদের কিছুই নেই, তাদের কী হবে?’

সিএনএন অবলম্বনে

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল