
সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই ইন্টারনেটে উন্মুক্ত এটিজে সিস্টেম নিয়ে সতর্ক করে আসছেন
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গ্যাস স্টেশনের জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংকের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, এই হামলার পেছনে ইরান-সমর্থিত হ্যাকারদের হাত থাকতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, হ্যাকাররা এমন কিছু অটোমেটিক ট্যাংক গেজ (এটিজে) সিস্টেমে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে, যেগুলো ইন্টারনেটে উন্মুক্ত ছিল এবং পাসওয়ার্ড সুরক্ষা ছিল না। এর ফলে তারা কিছু ক্ষেত্রে ট্যাংকের ডিসপ্লেতে দেখানো তথ্য পরিবর্তন করতে পেরেছে, যদিও বাস্তবে জ্বালানির পরিমাণে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
এখন পর্যন্ত এসব সাইবার হামলায় কোনো শারীরিক ক্ষতি বা দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, যদি কেউ এ ধরনের সিস্টেম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তাহলে গ্যাস লিকের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিও আড়ালে থেকে যেতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অতীতে গ্যাস স্টেশনের ট্যাংক ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ইরানের সাইবার তৎপরতার ইতিহাস থাকায় দেশটিকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত ডিজিটাল প্রমাণ না থাকায় চূড়ান্তভাবে দায়ী পক্ষ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সিআইএসএ এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। এফবিআই’ও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হলে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে তেহরানের আরেকটি সাইবার হুমকি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের হামলা আরও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করছেন, ইরান সংক্রান্ত সংঘাত তাদের আর্থিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু বছর ধরে সতর্কতা দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তার আওতায় আসেনি। ইরান সমর্থিত হ্যাকাররা বরাবরই এমন দুর্বল ও সহজ টার্গেট খুঁজে বের করার চেষ্টা করে থাকে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল সংঘাতের পরও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ইরান ঘনিষ্ঠ হ্যাকারদের হামলার অভিযোগ উঠেছিল। তখন কিছু সিস্টেমে ইসরায়েলবিরোধী বার্তাও প্রদর্শন করা হয়েছিল।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই ইন্টারনেটে উন্মুক্ত এটিজে সিস্টেম নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। ২০১৫ সালে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রো পরীক্ষামূলকভাবে কিছু ভুয়া এটিজে সিস্টেম অনলাইনে চালু করলে দ্রুতই একটি ইরানপন্থী হ্যাকার গোষ্ঠী সেখানে আক্রমণের চেষ্টা চালায়।
২০২১ সালে স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অভ্যন্তরীণ নথিতে গ্যাস স্টেশনের ট্যাংক ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য সাইবার হামলার লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সাইবার কার্যক্রম আরও দ্রুত ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তেল-গ্যাস, পানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতেও বিভিন্ন ধরনের হামলার অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলের জাতীয় সাইবার প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রধান ইয়োসি কারাদি বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানি সাইবার হামলার গতি ও পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, ‘ইরানি গোষ্ঠীগুলো এখন সাইবার জগতে যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই আঘাত করার চেষ্টা করছে।’
সাইবার বিশ্লেষক অ্যালিসন উইকফ জানান, ইরান এখন দ্রুতগতিতে নতুন ধরনের ম্যালওয়্যার তৈরি করছে এবং তথ্য ফাঁস ও প্রচারণাভিত্তিক সাইবার অভিযানে আরও সক্রিয় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ঘনিষ্ঠ অনেক হ্যাকার গোষ্ঠী টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের হামলার প্রচার চালায় এবং বাস্তবের চেয়ে বড় সাফল্যের দাবি করে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করে।
আগামী মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখেও উদ্বেগ বাড়ছে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ইরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও তথ্যযুদ্ধ চালাতে পারে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প






































