
এআই ক্যামেরা স্থাপনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মোড় এবং ব্যস্ত সড়কগুলোতে এই আধুনিক এআই-ভিত্তিক পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) ক্যামেরা স্থাপনের ফলে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে আইন মানার একটি ইতিবাচক ও দৃশ্যমান প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
এই বিশেষ ক্যামেরাগুলো ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরতে পারে এবং দূর থেকে নিখুঁতভাবে যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে সক্ষম। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, স্টপ-লাইন অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, বেআইনি লেন পরিবর্তন, জেব্রা ক্রসিং দখল, অবৈধ পার্কিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং সিটবেল্ট না বাঁধার মতো অন্তত ছয়টি ট্রাফিক অপরাধ এই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে।
গত ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে ইতোমধ্যে জনগণের সাড়া মিলেছে। ডিএমপির সদর দপ্তরে গত ২৯ এপ্রিল এই বিশেষ সফটওয়্যারটির উদ্বোধন করেছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির।
ডিএমপির মুখপাত্র ও উপ-কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন এই উদ্যোগের অগ্রগতি জানিয়ে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ১২০টি এআই-চালিত ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ২০টিরও বেশি ক্যামেরা বর্তমানে পুরোপুরি সচল রয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা শহরকেই এই এআই নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত সোমবার পর্যন্ত এআই ক্যামেরা সিস্টেমের মাধ্যমে মোট ৫০২টি ডিজিটাল মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালকদের আচরণে বড় পরিবর্তন এনেছে। সরেজমিনে বিজয় সরণি মোড় ও কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁও হোটেলের মোড়ে দেখা গেছে, সিগন্যাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়িগুলো স্বয়ংক্রিয় মামলার ভয়ে স্টপ-লাইনের পেছনে থেমে যাচ্ছে এবং কেউ জেব্রা ক্রসিং দখল করছে না।
অন-ডিউটি ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ক্যামেরার কঠোর নজরদারির কারণে চালকরা আর আইন ভাঙার সাহস পাচ্ছেন না। পুলিশকে এখন আর বাড়তি কষ্ট করতে হচ্ছে না, তারা শুধু লাইটের সংকেত অনুযায়ী গাড়ি ছাড়ার ইশারা দিচ্ছেন।
ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ) জানায়, এই সিস্টেমটি সরাসরি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ির প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে আইন লঙ্ঘনের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ডিএমপি সার্ভারে জমা হওয়ার পর কর্মকর্তারা তা পর্যালোচনা করে ‘ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যার’-এর মাধ্যমে মামলা দিচ্ছেন। ব্যবস্থাটি নতুন হওয়ায় আপাতত ছোটখাটো ভুলগুলোকে কিছুটা শিথিল দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে এবং বর্তমানে ডাকযোগে মামলার নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।
তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসএমএস ও অ্যাপভিত্তিক নোটিফিকেশন চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের, যেখানে চালকরা লিঙ্কের মাধ্যমে নিজেদের আইন লঙ্ঘনের ভিডিও ফুটেজও সরাসরি দেখতে পাবেন। ডিএমপি মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, প্রযুক্তির এই ব্যবহার যানজট কমাতে সাহায্য করলেও ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতির টেকসই উন্নতির জন্য সড়ক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ এবং একই রুটে ভিন্ন গতির যানবাহন চলাচল কমানোর মতো ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশব্যাপী পুলিশিং ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি অংশ এটি, যা ভবিষ্যতে নগর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ ও ডিপফেক জালিয়াতি মোকাবিলাতেও বড় ভূমিকা রাখবে।













































