
পুতিনের পরিকল্পনা ছিল, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশাল সেনাশক্তি ও জনবল ব্যবহার করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নাকি মন্তব্য করেছেন, একদিন ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত হতে পারেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, শির এই মন্তব্য পুরোপুরি অমূলক নয়। বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়া এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে। আর এটিই ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রাশিয়ার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
পুতিনের পরিকল্পনা ছিল, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশাল সেনাশক্তি ও জনবল ব্যবহার করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
বরং চলতি বছরে রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনই কিছু এলাকায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ সেনাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিও করছে।
পশ্চিমা বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি মাসে রাশিয়ার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা নিহত বা আহত হচ্ছে। অথচ এত বড় ক্ষতির পরও রাশিয়া উল্লেখযোগ্য নতুন এলাকা দখল করতে পারছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার মোট হতাহত সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার ভেতরেও বাড়ছে চাপ
যুদ্ধের প্রভাব এখন রাশিয়ার ভেতরেও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি রাশিয়ার পার্লামেন্টের এক সদস্য প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা হয়তো রুশ অর্থনীতির নেই। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এমনকি পুতিন নিজেও সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধ হয়তো শেষের দিকে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যিনি এই যুদ্ধকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন, তার এমন মন্তব্য অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
ড্রোন যুদ্ধ বদলে দিয়েছে পরিস্থিতি
বর্তমান ইউক্রেন আর কেবল আত্মরক্ষায় ব্যস্ত একটি দেশ নয়। বরং তারা যুদ্ধের ধরনই বদলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গণহারে উৎপাদিত স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউক্রেন রাশিয়ার সেনাদের জন্য সামনের যুদ্ধরেখাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এখন অনেক এলাকায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রবেশ করলেই রুশ সেনারা ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে।
ইউক্রেনের ড্রোন এখন রাশিয়ার গভীর এলাকাতেও হামলা চালাচ্ছে। সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, অস্ত্রগুদাম, জ্বালানি অবকাঠামো ও সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত আঘাত হানা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মস্কো পর্যন্ত ইউক্রেনীয় ড্রোন পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কাই পুতিনকে ‘ভিক্টরি ডে’ উদযাপনের সময় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী করেছিল। কারণ ওই সময় রাজধানীতে সামরিক কুচকাওয়াজে ড্রোন হামলার ঝুঁকি ছিল বড় উদ্বেগ।
সম্প্রতি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাও জানিয়েছে, মস্কোর কাছাকাছি এলাকায় বড় ধরনের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা হয়েছে।
পুতিনের মূল লক্ষ্য এখন অনেক দূরে
যুদ্ধ শুরুর সময় পুতিনের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা, ন্যাটোকে দুর্বল করা এবং রাশিয়াকে আবারও ইউরেশিয়ার প্রধান শক্তিতে পরিণত করা। কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন। রাশিয়ার পক্ষে কিয়েভ দখলের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধ এখন মূলত ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চল ঘিরেই সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে ন্যাটো দুর্বল হওয়ার বদলে আরও বড় ও শক্তিশালী হয়েছে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন জোটটিতে যোগ দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরও রাশিয়া খুব বেশি অর্জন করতে পারেনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাইওয়ান নিয়ে চীনের হিসাব-নিকাশ
শি জিনপিংয়ের মন্তব্যকে শুধু রাশিয়া প্রসঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে না। বরং বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে চীনও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিচ্ছে—বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে।
শি এরই মধ্যে চীনের সেনাবাহিনীকে ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তবে চীনা সেনাবাহিনী এখনও বড় কোনো যুদ্ধে পরীক্ষিত নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে দ্রুত রাজনৈতিক পতন ঘটানো কতটা কঠিন হতে পারে। আগামী কয়েক মাসে চীন এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের কূটনীতির সামনে নতুন সুযোগ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান করা। তবে এতদিন তার অবস্থান ছিল—ইউক্রেন তুলনামূলক দুর্বল, তাই তাদেরই বেশি ছাড় দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
এখন ইউক্রেন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। একই সঙ্গে রাশিয়া ক্রমবর্ধমান সামরিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে। এরপর খুব বেশি অগ্রগতি না হলেও সামনে আবার আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ থামাতে চাইলে ট্রাম্পের উচিত ইউক্রেনকে দুর্বল ধরে নেওয়ার বদলে রাশিয়ার বর্তমান দুর্বলতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ এখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে মস্কোকে চাপ দিয়ে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হতে পারে।











































